আনোয়ার-মাহাথিরের দুঃসাহসিক অভিযান

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮ | আপডেট: ১২:৫০:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮
ছবিঃ সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক নেতা আনোয়ার ইব্রাহীম সম্পর্কে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের যত সন্দেহ এবং দ্বিধা রয়েছে তার বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ।

তবে আনোয়ার ইব্রাহীম জোর দিয়ে বলেন, অনেকেই তার এবং ড. মাহাথিরের মধ্যকার শত্রুতা সৃষ্টির জন্য তাদের দুজনকে নিয়ে রাজনৈতিক কূটকৌশল খেলায় মত্ত রয়েছে এবং তাদের দুজনকে আলাদা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি সরাসরি করো নাম উল্লেখ করেন নি।

এসব কিছুর পরেও আনোয়ার ইব্রাহীম জানিয়েছেন তার সাথে ড. মাহাথিরের গভীর সুসম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু ড. মাহাথির আনোয়ারের সাথে তার সম্পর্কের ব্যাপারে খুব কমই জানিয়েছেন।

সম্প্রতি BBC Hard Talk show নামে অনুষ্ঠানে ড. মাহাথিরের দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানান, আনোয়ার ইব্রাহীমের জন্য একটি হতাশাজনক খবর রয়েছে। আনোয়ার ড. মাহাথিরের সাথে পুনরায় একটি দৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন এমন একটি প্রশ্নের উত্তরে বিবিসির ওই অনুষ্ঠানে ড. মাহাথির বলেন, ‘এটি তার (আনোয়ারের) নিজস্ব মতামত।’ ড. মাহাথিরের এমন মন্তব্যের ফলে অনেকেই মাহাথিরের প্রতি আনোয়ারের সাম্প্রতিক অনুরাগকে অনেকটা প্রতিদান হীন ভালোবাসার সাথে তুলনা করেছেন।

আনোয়ার তার সাবেক রাজনৈতিক গুরুকে তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাদের দুজনের মধ্যে এখন পূর্বের তুলনায় সুসম্পর্ক বিরাজ করছে এমন কথা যতই বলেন না কেন, ড. মাহাথির সম্পর্কে কোনো আলোচনা করতে গেলে তার চোখে মুখে স্পষ্ট হতাশা ফুটে উঠে।

যে ব্যক্তি আনোয়ারের সম্মান নষ্ট করে তাকে কারাগারে প্রেরণ করেছে সেই ব্যক্তিকেই এখন দেশের ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর অন্যদিকে তাকে এখনো মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে যেতে হচ্ছে।

চলতি বছরের মে মাসের ১০ তারিখে আনোয়ার অনেকটা নিজের অজান্তে বলে ফেলেছেন যে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরের নয় বরং তার শপথ নেয়ার কথা ছিল। তবে তিনি পরবর্তীতে তার এমন মন্তব্যকে কৌতুক বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

পুরানো দ্বন্দ্ব ফিরে যাওয়া
আনোয়ারের ভাষ্য মতে, তিনি এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী তার নির্বাচনী প্রচারণায় ফিরে যেতে চান। এজন্য তিনি বিভিন্ন সভায় লেকচার দিবেন, বিশ্ব নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখবেন।

তথাপি তিনি মনে করেন, প্রচারণায় ফিরে আসতে তিনি যত দেরি করবেন তার পুরআনো শত্রু তাকে তত বেশী রাস্তার ধারে ফেলে রাখতে চাইবেন। এর পাশাপাশি তিনি মালয়েশিয়ার আইনসভায় দ্রুতই একটি শক্ত অবস্থান নিতে পরবেন এমন ধারণাও ভুল। তবে তার জন্য এখনও সুযোগ রয়ে গেছে আর তা হচ্ছে পোর্ট ডিকসনের নির্বাচনে জয় লাভ করা।

ড. মাহাথিরের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য আনোয়ারের কাছে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত যে পথটি খোলা রয়েছে তা হচ্ছে- আসন্ন পোর্ট ডিকসনের উপ-নির্বাচনে জয় লাভ করা। সবকিছুর পরেও তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল পাকতান হারপানের প্রেসিডেন্ট।

সময় আনোয়ারের পক্ষে নয়
মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এই মত জোরালো হচ্ছে যে, মাহাথির ‘রাষ্ট্রের কাজ সামলাবে’ আর আনোয়ার ‘আইনসভায় পরিবর্তন আনা নিশ্চিত করবেন’। তবে এই রকমটি হলে কি দাঁড়াবে তা যদিও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, কিন্তু এর মাধ্যমে আনোয়ার তার ফিরে আসাকে নিশ্চিত করতে পারবেন।

একই সাথে আনোয়ার ইব্রাহীমের জন্য মালয়েশিয়ার ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী পদে বিশ্বাসযোগ্য কেউ একজনকে দরকার যাতে করে তিনি অন্য কাউকে মই বেয়ে উপরের দিকে উঠতে বাধা দিতে পারেন। শুধুমাত্র সময়ই বলে দিবে আনোয়ারের জন্য কোন পরিকল্পনা কাজে আসে কিন্তু বর্তমানে পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সময় তার পক্ষে নয়। তিনি যত বেশী অপেক্ষা করবেন তার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশী কমে আসবে।

পোর্ট ডিকসনের উপ-নির্বাচন
পোর্ট ডিকসনের উপ-নির্বাচনে জয় লাভ করা আনোয়ার ইব্রাহীমের জন্য তেমন একটা ঝুঁকির বিষয় হবে না। তবে যদি এই উপ-নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতি হয় বা তিনি যদি নামে মাত্র ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন তখন তার বিরোধীরা এটা বলার সুযোগ পাবে যে, ভোটারগণ আনোয়ারের প্রার্থিতা নিয়ে অত বেশী আশাবাদী নন।

এদিক থেকে পোর্ট-ডিকসনের নির্বাচন আনোয়ারের জন্য প্রথম বড় কোনো পরীক্ষা হতে চলেছে। যদি এটি হয়েও যায় তখন আনোয়ারের সামনে সব রকমের বড় বড় পদক্ষেপ নেয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি আনোয়ারের নির্বাচনী প্রচারণাকে থমকে দিতে তার বিরোধীরা অনেক রকম পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। মালয়েশিয়ার স্যোশাল মিডিয়াগুলোতে তার বিরুদ্ধে সবরকমের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্যোশাল মিডিয়ার এসব প্রচারণায় তার পূর্বের যৌন কেলেঙ্কারির বিষয় গুলো বেশী বেশী প্রচার করা হচ্ছে।

আনোয়ারের জন্য উভয় সংকট
অনেক দিক থেকেই আনোয়ার বিজয়ী হওয়ার মত পরিস্থিতিতে নেই। যদি তিনি তার প্রচারণা থামিয়ে দেন তবে তিনি হয়ত রাস্তার ধারেই পড়ে থাকবেন। আর যদি তিনি মালয়েশিয়ায় তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন তবে তখন তাকে ধৈর্য হারা দেখাতে পারে।

মালয়েশিয়ার উন্নয়ন সম্পর্কে তার মন্তব্য, বিভিন্ন আইনের সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা এবং যেসব দেশে তিনি সফর করবেন বলে শোনা যাচ্ছে তাতে করে তার প্রতি দেশটির জনগণের সমর্থন কমে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। মালয়েশিয়ার নাগরিকেরা তার এমন কর্মকাণ্ডকে অধৈর্যের পরিচয় এমনকি ড. মাহাথির কে নিচু করার উদ্যোগ বলে মনে করছেন।

তিনি এমনকি তার নিজেকে সাহায্য করার জন্য দেশটিতে বিদ্যমান সমকামিতা রোধী আইনের সংশোধনের কথা বলেননি। প্রসঙ্গত, মালয়েশিয়ার সমকামিতা রোধী আইন বেশ কয়েক বছরের পুরনো একটি আইন।

সামনে তাকিয়ে দেখা
অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই মালয়েশিয়ার ক্ষমতার ক্ষেত্রে ড. মাহাথির হচ্ছেন ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি এবং ক্ষমতা পাওয়ার জন্য অন্যতম অনুগ্রহকারী ব্যক্তি। একই সাথে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে ড. মাহাথির মালয়েশিয়ার জনগণের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি যত বেশী সময় ধরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকবেন তিনি তত বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠবেন।

একজন বহিরাগত ব্যক্তি হিসেবে আনোয়ারকে ড. মাহাথিরের পদ দখল করতে হলে অনেক বেশী কাঠখড় পোহাতে হবে। তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, তার সম্পর্কে মালয়েশিয়ার জনগণের নেতিবাচক দিকগুলোকে ইতিবাচক দিকে রূপান্তর করা।

সত্যিকারের বিষয় হচ্ছে আনোয়ারের মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে জাতি এখনো দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে আছে। যদিও তাকে সমকামিতার দায়ে কারাগারে প্রেরণ করাকে মালয়েশিয়ার জনগণ তার প্রতি একটি অবিচারমূলক কাজ বলে মনে করে তবুও তারা তাকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

একই সাথে ড. মাহাথিরকে মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন পরিবর্তন আনার দায়ে দেশটির জনগণ অত সহজে ক্ষমা করে দিবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু এতকিছুর পরেও তারা সংস্কারপন্থী আনোয়ারকে যিনি নতুন মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব দিতে চান তাকে ক্ষমতায় আনার জন্য একমত নয়। তাদের মতে ভাগ্য হচ্ছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ক্রীড়নক।

লেখক : ডেনিস ইগনাটিয়াস
সূত্রঃ ডেনিস ইগনাটিয়াস, সাবেক রাষ্ট্রদূত, ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে।