আমার যা হওয়ার তাই হয়েছে: নাজমুল হুদা

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩, ২০১৮ | আপডেট: ১২:৩১:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩, ২০১৮

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দুটি খাতে মোট সোয়া তিন কোটি টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার কাছে। এই বাসনা পূরণ না করায় সাবেক প্রধান বিচারপতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন বলে দাবি এই আইনজীবীর।

সোমবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসির নিয়মিত টকশো ‘সংবাদ সম্প্রসারণ’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে যুক্ত হয়ে নাজমুল হুদা এসব তথ্য জানান।

শারমিন চৌধুরীর সঞ্চালনায় টকশো অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ এবং দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

ঘুষ চেয়ে তা না পেয়ে আইনের পরিপন্থী বেশ কিছু কাজ করেছেন সাবেক বিচারপতি- এমন অভিযোগ করে নাজমুল হুদা বলেন, ‘উনি আমার কাছে ঘুষ দাবি করেছিলেন এবং সেটা না পাওয়ার দরুন বেশ কিছু জঘন্য কাজ করেছেন, যেগুলো আইনের পরিপন্থী।’

‘টাকার বিনিময়ে আমার কেস থেকে আমাকে অব্যাহতি দেয়ার কথা আমাকে বলেছিলেন এবং ওই কেসগুলো পুনরুজ্জীবিত করে আমাকে তিনি একটা কিছু করবেন এমন হুমকির ইঙ্গিত ছিল। আমি তার সে বাসনা পূরণ করিনি। আমার যা হওয়ার তাই হয়েছে।’

অভিযোগ প্রমাণের যথেষ্ট প্রমাণ হাতে নিয়েই তিনি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন বলে দাবি নাজমুল হুদার। বলেন, ‘আমার কাছে যে রেকর্ড আছে, কোর্টের কল লিস্ট আছে, তার অর্ডার আছে। সবকিছুর মধ্য দিয়ে সেটা খুব ভালোভাবে প্রমাণিত।’

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দেশ ছেড়েছেন বেশ কয়েক মাস আগে। বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। সেখানকার রাজনৈতিক আশ্রয়ে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের চেষ্টাও করছেন দেশের সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।

তার বিরুদ্ধে মামলা করতে এতটা সময় কেন নেয়া হলো, সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বলেন, ‘যখন তিনি আসনে বসে থাকেন তখন তো তার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার উপায় নাই। তিনি চলে যাওয়ার পর তার বিভিন্ন রকমের গুণাগুণ যখন বেরিয়ে আসা শুরু করল, তখন আমি মনে করলাম আমার নিজেরটাও আমি করব।’

এই বিলম্ব কোনো বিলম্ব নয় বলেও মনে করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘অনেক মামলা বছরের পর বছর বসে থাকে। এটা একটা স্বাভাবিক ডিলে, এটা তো কোনো ডিলে না।’

বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে করা নাজমুল হুদার মামলা উদ্দেশ্যপ্রণীত বলে মনে করেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ- ‘এটা খুব পরিষ্কার যে সামনে নির্বাচন আসছে। জনাব নাজমুল হুদা সরকারের প্রতি তার আনুগত্যটা প্রবলভাবে দেখাতে চান, যেন তার মনোনয়নটা নিশ্চিত হয়।’

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিএনপি থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর দুই দফা দল গঠন করেছেন। প্রথম দফায় দলে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে। পরে তৃণমূল বিএনপি নামে আরেকটি দল গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে নামস্বর্বস্ব ৫০টি দল নিয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএনএ) জোট করেন, যার প্রধান তিনি।

এই জোট নিয়ে নাজমুল হুদা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘ দিন ধরে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ জোটের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। আগামী নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশাও করছেন।

মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘তার (নাজমুল) মনোনয়ন সম্পর্কে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার যেটি পৈতৃক সম্ভাবনাময় আসন (দোহার), সেখানে এখন প্রার্থী তার চাচা (সালমান এফ রহমান)। এখান থেকেই নাজমুল হুদা বারবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।’

আওয়ামী লীগ থেকে নয়, মহাজোট থেকে নিজের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ঠুকেছেন নাজমুল হুদা- এমনটাই মনে করেন এই সিনিয়র সাংবাদিক।

মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘শুনেছি, উনি নিজে চাচ্ছেন গুলশান থেকে দাঁড়ানোর জন্য। পোস্টারও লাগিয়েছেন। এটা তো তার একেবারেই অপরিচিত এলাকা। এই এলাকা থেকে তিনি দাঁড়িয়ে কী করতে পারবেন, আবার এখান থেকে তিনি মনোনয়ন পাবেন কি না এটাও নিশ্চিত না।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে সরকারের মধ্যে এখন উষ্মা বিরাজ করছে। এ সুযোগটা নিচ্ছেন নাজমুল হুদা।

দুর্নীতির মামলার ক্ষেত্রে একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে মামলা করেন এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এই সাংবাদিক। একই সঙ্গে এ ধরনের মামলা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘একজন শুদ্ধ মানুষ যখন দুর্নীতির মামলা করেন তখন তার একটা ব্যাখ্যা হতে পারে। যার চরিত্র নিয়ে অস্বচ্ছতা আছে, তিনি যখন দুর্নীতির মামলা করেন তখন সেখানে আরেক ধরনের প্রশ্ন ওঠে। কোনো প্রতিষ্ঠান না হয়ে, একজন ব্যক্তি আর একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এভাবে মামলা করতে পারেন কি না সেটাও আমার কাছে খুব একটা পরিষ্কার না।’

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগুলো নতুন নয় বলে মনে করেন অন্য আলোচক দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। তবে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বহু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়েছেন।

এবং তারা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হয়েছেন। এটা নতুন কিছু না। নাজমুল হুদার মামলাটি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠবে। কারণ নাজমুল হুদার রাজনৈতিক অবস্থায় নিয়েও নানা রকম কথাবার্তা আছে।’

ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ প্রমাণ সহজ হবে না। তবে নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলা থেকে পরিত্রাণের আশায় এই ধরনের মামলা করে থাকতে পারেন নাজমুল হুদা। এমনটা মনে করেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ। বলেন, ‘আপনি আমার কাছে ঘুষ চেয়েছেন এটা প্রমাণ করা বেশ কষ্টের। কারণ এস কে সিনহা যে পর্যায়ের এবং নাজমুল হুদা যে পর্যায়ের, তারা ঘুষ চাইলে কাউকে সমনে রেখে ঘুষ চাইবে না। এগুলো আমি যেটা বুঝি, হয়রানি করার জন্য।’

মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘তার (নাজমুল) মনের মধ্যে একটা দুঃখ তো আছেই, তিনি দুর্নীতির একটা মামলায় অভিযুক্ত। রায় কিন্তু এখনো বহাল আছে, যেটায় এখনো তিনি খালাস পাননি। তার মনের মধ্যে হয়তো এটা কাজ করে, তিনি যদি এগুলো করেন তাহলে হয়তো ওই সব মামলা থেকে খালাস পেয়ে যেতে পারেন।’