জমে উঠেছে হাকালুকি হাওরে রাখালী ব্যবসা!

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৩৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯ | আপডেট: ৯:৩৬:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

শাকির আহমদ, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। বর্ষাকালে চারিদিকে থৈ থৈ পানি। ওইসময় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো হাকালুকি হাওর পাড়ের মানুষ। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে অনেকটা বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকতে হয় বেশীরভাগ মানুষের। এর মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্ষেত করে তা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে এই শুষ্ক মৌসুমে হাকালুকি পাড়ের ঐতিহ্যবাহী রাখালী ব্যবসা পরিচালনা করে অনেক মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।

হাকালুকি হাওরের বিশাল এলাকায় গড়ে উঠে একাধিক বাথান বা রাখালি ব্যবসা। ওই সময় মাছ আর পরিযায়ী পাখির সঙ্গে গবাদী পশু গরু-মহিষেরও বিচরণ দেখা যায়। আলাদা আলাদা লোক বিভিন্ন স্থানভেদে হাওরজুড়ে চড়ায় হাজার হাজার গরু ও মহিষের দল। বিশাল ভূমিজুড়ে সবুজ ঘাসের রাজ্যে তাদের জন্য রয়েছে নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থান। বস্তিতে খাদ্য সংকটের এসময়টায় উৎকৃষ্ট খাবার সবুজ ঘাস খেয়ে হাওর জুড়ে বিচরণ করে বাথানের অধীনে এসব গরু-মহিষ। আর বাথানে এইসব গবাদী পশু দিয়ে নিশ্চিন্তে নিরাপদ হন তাদের মালিকরা।

হাওরের এই চিরচেনা ঐতিহ্য আজ অনেকটা হুমকীর মুখে। এমনটি অভিযোগ খোদ স্থানীয় বাথান আয়োজকদের। নানা সংকট ও সমস্যায় এই রেওয়াজ এখন ধরে রাখা কষ্ট সাধ্য।

জানা যায়, রাখালির টাকা, গবাদী পশুর প্রসবজাত বাচ্চা, দুধ আর গোবর সংগ্রহে জমে উঠে বাথান ব্যবসা। হাওরের বুকে শুষ্ক মৌসুমের উৎকৃষ্ট সেবামূলক ব্যবসা এটি। পুঁজিহীন কায়িক পরিশ্রমে গড়ে উঠা এই ব্যবসার নামই বাথান। স্থানীয়দের জন্য ব্যবসাটা অনেকটাই লাভজনক। হাওর অঞ্চলের এই বাথান বা রাখালি ব্যবসার সুনাম কিংবা কদর রয়েছে গো-মহিষের মালিকদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, এখন পুরো হাকালুকি হাওরে ছোট বড় মিলে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বাথান। যাতে আশ্রয় হয়েছে কয়েক হাজার দেশীয় জাতের গরু ও মহিষের। দেশের বিখ্যাত হাকালুকি হাওরে এখন ঠাঁই নিয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথি পাখি আর স্থানীয় গরু ও মহিষ।

খাদ্য সংকটে থাকা এসকল ক্ষণস্থায়ী অতিথিরা জীবনের তাগিদে হাওরে ঠাঁই নেওয়ায় বেড়েছে হাওরের সৌন্দর্য। একেক বাথানে জমায়েত গরু কিংবা মহিষ শতাধিক মালিকের। হাওরের বুকে ঠাঁই নিয়েছে বিভিন্ন এলাকার নানা রং ও আকৃতির গরু কিংবা মহিষ। খাদ্য সংকট এলাকার এসকল গরু ও মহিষের ৪ থেকে ৫ মাস ওখানেই হয় নিরাপদ আশ্রয়। হাওরের সবুজ ঘাস খেয়েই তারা হৃষ্ট পুষ্ট হবে। ৪০০-৫০০ কিংবা তারো অধিক গরু কিংবা মহিষ বিশাল দলের দেখভাল করছেন ১০-১৫ জন লোক। কেউবা দুধ দোহন করেন কেউবা রাখালি করছেন আর কেউ কেউ পানি খাওয়াচ্ছেন বা তাদের গোসল দিচ্ছেন। এক সঙ্গে এতসব গরু মহিষের বিচরণ বেড়াতে আসা মানুষদের করে আকৃষ্ট।

হাওরজুড়ে ২৩৮টি বিলের অনেক বিলেই এখন নেই পানি। হাওরের মাঝখান অনেকটা মরুভূমির মতো দেখতে বিলগুলোতে সবুজ ঘাসের আধিক্যতা। এখন ভর শুস্ক মৌসুম তাই হাওর ছাড়া অন্য এলাকায় গুরু মহিষের খাদ্য সংকট। এমনিতে এসময়টায় হাল চাষ না থাকায় অনেকটা কাজ ছাড়াই এখানকার মানুষদের অলস সময় কাটে গরু মহিষ বিচরণ করে। একদিকে নিজেদের কাজ নেই অন্যদিকে গো-মহিষের খাদ্য সংকট। হাওর এলাকা ছাড়া অন্য (উজান) এলাকাতে পানির অভাবে আগের ঘাসগুলোও মরে গেছে। তাই ওইসব এলাকার গো-মহিষের মালিকরা আগের জমিয়ে রাখা আউশ কিংবা আমন ধানের শুকনো খড়কুট খাইয়ে কোনোরকম ওদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এমন খাদ্যহীনতায় আর এই দুর্যোগপূর্ণ সময় কাটিয়ে উঠতে মালিকদের তাই বিকল্প চিন্তায় গড়ে উঠেছে রাখালী ব্যবসা।

সরেজমিনে হাকালুকি হাওরের গৌড়কুরী ও চৌকিয়া বিল এলাকায় গেলে দেখা যায়, শীতের হিম হিম বাতাসের মাঝে প্রখর রৌদ্রে চারিদিকে আলাদা জায়গায় সংঘবদ্ধভাবে গরু-মহিষ চড়াচ্ছেন রাখাল। ১০ থেকে ১২ জন আলাদা করে প্রায় ৫ শতাধিক গরু-মহিষ বাথান করছেন। কেউ কেউ বিলের পাশ ঘেঁষা পানিতে গবাদী পশুদের গোসল করাচ্ছেন। কেউ কেউ দুধ দোহন করছেন।

এসময় বাথান মালিক রফিক মিয়া, কনর মিয়া, ফারুক, মছব্বির জানান, প্রতি বছরের অগ্রাহয়ন ও পৌষ মাসে এসব গরু-মহিষ দেখভাল করার জন্য তাদের মালিকরা এখানে রেখে যান। আবার বৈশাখ মাসে এসে নিয়ে যান। প্রতি গরু কিংবা মহিষ বাবত মালিকরা ৫শত থেকে হাজার টাকা দিয়ে যান। তবে এসব গবাদী পশু পালনে কোন নির্দিষ্ট টাকার পরিমান নির্ধারণ করা নেই। তারা জানালেন, টাকা-পয়সার জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকলেও এটা অনেকটা আন্তরিকতার খাতিরে লেনদেন হয়।

তাঁরা আরও জানান, যদিও বাথান করতে মালিকরা টাকা কম-বেশী যা দেন তাতেই চলে। তবে দুধের গাভী (গরু অথবা মহিষ) থাকলে মালিকরা কোন টাকা দেন না, বাথান ব্যবসায়ীরাও টাকা নেননা। মূলত গাভীর দুধ বিক্রি করে ব্যবসা হয়ে যায়। তাছাড়া গরুর গোবরও বিক্রি করা যায়। একেকটি বাথান থেকে কয়েক শ’ লিটার দুধ পাওয়া য়ায়। এদিয়েই তাদের বাথান ব্যবসার মূল আয়। দুধ আর গোবর বিক্রি করে প্রতিদিনই নগদ আয় হয়। দুধের পাইকাররা তাদের বাথান থেকেই দুধ কিনে নেন। এছাড়া মালিকরা তাদের গরু মহিষ নেওয়ার সময় দিয়ে যান নগদ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিনের খরচ পরে বাথান শেষ হলে মোটা অঙ্কের টাকা তাদের ভাগে ঠিকে।

এদিকে খাওয়া দাওয়া আর ঘুমানোর কষ্ট ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা না থাকলেও পানি সংকট প্রকট। গরু মহিষের গোসল আর পানি খাওয়াতে তাদের অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হয়। যে সকল বিলে পানি আছে সেগুলো ইজারা নেওয়া। এসব বিল থেকে পানি নিতে বাধা দেন ইজারাদাররা। যে সমস্যাটি কয়েক বছর আগে খুব কম ছিল এখন তা বড় সমস্যা হয়ে বাথান ব্যাবসায়ীদের দূর্ভোগে ফেলেছে। তাছাড়া গরু মহিষের নানা রোগবালাইয়ে হাওর এলাকায় ডাক্তার পাওয়া কষ্টকর। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজনকে ডাকলেও তারা হাওর আসতে চান না। রোগাক্রান্ত হয়ে অনেক গরু মহিষ মারা যায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে।

এখন নানা কারণে অস্থিত্ব সংকটে হাকালুকি হাওর। তাই আগের মতো নেই বাথান বা রাখালি ব্যবসা। আর এমন সংকটে পড়ে অনেকটাই কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গরু মহিষের লালন পালন। স্থানীয়দের দাবি এই হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকার উদ্যোগী হলে বাথান ব্যবসাসহ ঠিকবে সকল উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর ঐতিহ্য।