তেঁতুল হুজুর, একজন শাহনাজ আপা ও আমাদের মানসিকতা

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৫৪:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯
ছবি: সংগৃহীত

উবারে কল দিলাম, ওপাশে রাইডার ফোন ধরে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া আমি মহিলা ড্রাইভার, আমার বাইকে চড়তে আপনার আপত্তি নাই তো?’ আমি যখন বললাম, আপত্তি থাকবে কেন! উনি তখন আসছি ভাইয়া বলে ফোন রেখে দিলেন। ভেসপা চালিয়ে রাইডার আসলেন।

রাইড শুরুর পর তিনি তার দুঃখের কথা শোনাতে লাগলেন। জানালেন, অনেক প্যাসেঞ্জার কেবল মাত্র মেয়ে হবার কারণে তার বাইকে চড়ে না। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “মাঝে মাঝে আমি ভাইয়া, অনেক দূর থেকে পিকআপ পয়েন্টে আসি। প্যাসেঞ্জার যখন দেখে আমি মেয়ে মানুষ, ওরা বলে, মেয়েদের বাইকে উঠব না, ক্যান্সেল করে দেন। আমি প্রতিবাদ করি না, আমার লস হলেও ক্যান্সেল করে দেই। জোর করে তো কিছু হয় না, তাই না?”

উনি আরো বলেন, “ভাইয়া প্রতিদিন এমন অনেক অভিজ্ঞতা হয়, আগে মন খারাপ হতো, ছেড়ে দিবো ভাবতাম। কিন্তু আমাকে তো রোজগার করতে হবে, আমার দুইটা মেয়ে। ওর বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছে, মেয়েদেরকে পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করতে হবে এই আমাকেই! মেয়েরা চাইলে পাঁচ মিনিটে হাজার টাকা কামাই করতে পারে। কিন্তু আমি ঐ লাইনে যাবো না, আমি সম্মানের সাথে রোজগার করি। আপনার মতো মানুষরা যখন আমাদের প্রশংসা করে, তখন খুব ভালো লাগে। মনে সাহস পাই।”

জিজ্ঞেস করলাম, পুলিশ ট্র্যাফিক সার্জেন্ট ওরা কেমন ব্যবহার করে? উনি খুশি হয়ে বললেন, ”ওরা খুব ভালো। আমাকে পারলে স্যালুট দেয়। আমি রুলস ব্রেক করি না।” তার বড় মেয়ে ক্লাশ নাইনে পড়ে, ছোটটা ক্লাশ ওয়ানে। আমাকে বলল, ”দোয়া করবেন, বড় মেয়েটা ইন্টার পাশ করে ভালো কোথাও চাকুরী পেলে আমি নিশ্চিন্ত। আজ বাসা থেকে বের হবার সময় বড় মেয়ে বাইরে যেতে না করলো। আমি বাইক নিয়ে বের হইছি। বাজার তো করা লাগবে, বলেন!”

শাহনাজ আপার বাইকে চড়ে আমি ফিল করলাম, একটা মেয়েকে প্রতিদিন কত শত প্রশ্নবোধক চোখের সামনে জীবন চালাতে হয়। মোহাম্মদপুর থেকে টিএসসি, যতগুলো সিগন্যালে বাইক থামল, আশেপাশের মানুষজন অবাক চোখে আমাদের বাইকের দিকে চেয়ে রইল। কয়েকজনের চোখে কৌতুক, কয়েকজনের নাক সিটকানো ভাব, পুরুষতান্ত্রিক ইগো! মেয়ে ড্রাইভারের পিছনে ছেলে বসেছে!

‘মেয়েদের স্কুল কলেজে যেতে দেবেন না’ বলে যারা আমাদের মেয়েদের দমিয়ে রাখতে চায়, তারা সমাজের জন্য কোনদিনও মঙ্গল কিছু বয়ে আনেনি। খুশির কথা এটাই যে শাহনাজরা ওইসব রক্তচক্ষুকে গোনাতেও ধরে না। সমাজ পরিবর্তন ঘটে শাহনাজ আপার মতো তেজী মানুষের হাত ধরে। স্যালুট শাহনাজ আপা।

লেখা: রফিউজ্জামান সিফাত

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দি বাংলাদেশ টুডে এবং দি বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

সুত্র: এগিয়ে চলো।