দুর্বল ও অপরিকল্পিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং কমিশন বাণিজ্যের দায় চিকিৎসকের?

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:১০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২০ | আপডেট: ১২:১০:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২০

আমাদের দেশের জনগণের মাঝে চিকিৎসকদের প্রতি বিরূপ মনোভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। যারা বিষাদাগার করেন তাদের কোনো দোষ আসলে তেমন নয়, তাদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও তাই করতাম!

সমস্যা হলো আমাদের দুর্বল ও অপরিকল্পিত স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনার, কিন্তু যেহেতু চিকিৎসকগণ সরাসরি জনগণকে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, তাই সব দোষ চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিগণ রুমে বসে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে গরম কফি খেতে পারেন!

হাসপাতালে মাত্রাতারিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসকগণ আপনাকে ভালোমতো সময় দিতে পারছেন না-চিকিৎসকের দোষ, হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না-চিকিৎসকের দোষ, ভর্তি হয়েছেন কিন্তু বিছানা পাচ্ছেন না-চিকিৎসকের দোষ, হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার মতো যথাযথ যন্ত্রপাতির জন্য সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না-চিকিৎসকের দোষ, এ রকম অসংখ্য দোষে চিকিৎসকরা আজ দোষী! অথচ এর জন্য কোনোভাবেই চিকিৎসক দায়ী নয়।

সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনার! ৫০০ বেডের একটি হাসপাতালে ৫০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে যখন ২ হাজার ৫০০ বা তারও অধিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হবে তখন চিকিৎসায় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অসংখ্য অভিযোগ আসবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এর দায় কোনোভাবে চিকিৎসকগণের ওপর বর্তায় না!

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যতদিন আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে ততদিন মনে হয় না, এর থেকে উত্তোরণ সম্ভব! পরিবর্তন আনতে হবে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায়, পরিবর্তন আনতে হবে কেনাকাটায়!

চিকিৎসকদের বিসিএস নামক নিয়োগ পরীক্ষায়, ‘উগান্ডার রাজধানীর নাম কি?’ এ জাতীয় প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর! আর জেনারেল এবং পেশাগত শিক্ষার একইভাবে মূল্যায়ন করা হয় না বলে বলতে হবে “পেশাগত” শিক্ষার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে!

এর জন্যই আজ অনেক চিকিৎসক হয় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, নয়তো জেনারেল ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন।

এত পরিশ্রম করে, জীবনের মহামূল্যবান সময় কেবলমাত্র চিকিৎসা শিক্ষায় ব্যয় করে চূড়ান্তভাবে চিকিৎসক হয়ে কেউই শখ করে পেশা বদল করতে চায় না বা বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় না!

সেই বিএসএস নিয়োগ পেয়ে একজন চিকিৎসক নবম গ্রেডের সুযোগ সুবিধা নিয়ে যখন তার কর্তব্যরত স্থানে একটি বসার চেয়ার, চিকিৎসা প্রদানের জন্য অত্যাবশকীয় যন্ত্রপাতি, যথাযথ সম্মান পায় না, তখন থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের হতাশা ভর করে!

আর কর্তব্যরত অবস্থায় শারীরিকভাবে আক্রমণের কথা নাই বললাম! তখনই মনে হয় এদেশে ‘চিকিৎসক’ হয়ে চিকিৎসার মতো মহান পেশায় আসাটাই মনে হয় জীবনের বড় ভুল!

চিকিৎসকদের মানবেতর জীবন শুরু হয় এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর থেকে! আমাদের দেশে ওষুধ বিক্রেতা হলো ডাক্তার, আর এমবিবিএস চিকিৎসক হলেন ‘ছোট ডাক্তার’!

এমবিবিএস পাশের পর শুরু হয় চাকরি খোঁজা সেিইসঙ্গে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ‘বিনা বেতনে’ বিভিন্ন মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা, উচ্চতর ডিগ্রির জন্য লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া, আর পেট চালানোর জন্য দূর-দূরান্তের জেলাসমূহে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে খ্যাপ মারা।

যদিও কোনোভাবে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উচ্চতর শিক্ষায় চান্স পেয়েও যায়, তাহলে মাসিক ভাতা ২০ হাজার! জ্বী এই টাকা দিয়েই তার লেখাপড়া এবং সংসার চালাতে হয়! ভাবছেন প্রাইভেট চেম্বার করবে!

তাহলে তার পরীক্ষায় পাশের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে! এমনিতে পাঁচ বছরের কোর্স সম্পন্ন হতে ৮-১০ বছরের অধিক সময়ও লেগে যায়, অনেকে আবার কোর্সটি সম্পন্নও করতেই পারেন না। পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম সিস্টেম আছে বলে জানা নেই।

সবাই ভাবেন সকল চিকিৎসক হয়তো প্রাইভেট চেম্বার করে অনেক অর্থ উপার্জন করেন। সে ধারণা একেবারেই ভুল।

হাতে গোণা কয়েকজন (ধরে নিলাম ৫০০-৬০০ জন) চিকিৎসক হয়তো প্রাইভেট চেম্বার করে অনেক টাকা আয় করছেন। কিন্তু এটা ৯০ হাজার চিকিৎসকের প্রকৃত চিত্র নয়।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা অগোছালো তা একটু ঢাকার দিকে তাকালেই বুঝা যায়! এক ঢাকায় সরকারি মেডিকেল কলেজ আছে চারটি, আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে ২০টিরও অধিক!

অথচ বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া উচিত ছিল যে জেলাগুলোতে সরকারি মেডিকেল কলেজ নেই সেখানে স্থাপন করতে হবে যাতে করে সেই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর মেডিকেল কলেজের কথা বলতে হয়। কর্তাব্যক্তিদের সঠিক পরিকল্পনার অভাব আর অবৈধ অর্থের প্রতি প্রবল আকর্ষণের ফলেই সহস্রাধিক প্রাইভেট হাসপাতালের মতো ঢাকায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছড়াছড়ি।

বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহের একই অবস্থা, সব ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকাকে অসুস্থ নগরী বললেও ভুল হবে না, যার সত্যিই চিকিৎসা দরকার, দরকার সঠিক পরিকল্পনা। ব্যাপারটা এমন আপনি দেশের যেখানেই অসুস্থ হোন না কেন মৃত্যুটা যেনো হয় ঢাকায়!

স্বাস্থ্যখাতে কর্তাব্যক্তিগণ কেনাকাটায় মহা উৎসাহী, বলতে কষ্ট হচ্ছে যে , সেখানে বেশির ভাগ সময় প্রয়োজনীয়তা, মেশিন চালানোর যথাযথ লোকবল না থাকার চেয়ে কমিশনটাই মূখ্য থাকে।

যেটার অনেক উদাহরণ বিভিন্ন হাসপাতালে বছরের পর বছর বাক্সবন্দী মেশিনের খবর নিলেই পাওয়া যাবে। অপ্রয়োজনীয় মেশিন গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করায় একজন সিভিল সার্জনকে উনার কর্মস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদাহরণও আছে! উনারা যদি পারতেন হয়তো দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য কয়েকটা ‘রকেট’ কিনে পাঠিয়ে দিতেন!

ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসায় অবহেলা বাংলাদেশের একটি কমন অভিযোগ! জ্বী এটাই হওয়ার কথা! সবারই কিছু সামর্থ থাকে, যখন সামর্থের বাইরে কিছু করতে হবে তখন সেখানে চিকিৎসায় অবহেলা বা যথাযথ চিকিৎসার অভাব হতে পারে।

তিন লিটারের বোতলে ১০ লিটার পানি রাখতে চাইলে ৭ লিটার পানিই পরে যাবে। ঠিক তেমনি নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগীর সেবা দিতে গেলে চিকিৎসায় অবহেলা, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া এটাই স্বাভাবিক।

স্বাস্থ্যসেবা একটি টিমওয়ার্ক, যার মধ্যে চিকিৎসক একটি উপাদান মাত্র। কেবল চিকিৎসক থাকলেই হবে না, সঠিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য প্রয়োজন প্রয়োজনীয় নার্স, সহযোগী লোকবল, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দরকারী যন্ত্রপাতিসহ নানাবিধ আনুষাঙ্গিক বিষয়াদি। কোনো একটির সঠিক জোগান না থাকলেই সঠিকভাবে চিকিৎসা প্রদান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অপচিকিৎসার আরেকটি বড় কারণ আমাদের দেশে, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। কিছু লোক যারা চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসক সেজে প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন!

অনেকে এদের ‘ভুয়া ডাক্তার’ খেতাব দিয়ে থাকেন। এর দায়ভারও কিন্তু চিকিৎসকের নয়! এমনও নজির আছে যে কোনো এক প্রাইভেট হাসপাতালে ভুয়া লোক চিকিৎসক হিসেবে কনসালটেন্ট সেজে বসে আছেন। আর তার অধীনে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক কাজ করছেন। এ ধরনের জালিয়াতির অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।

তবে দুর্বল ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে কিছু চিকিৎসক যে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে না বা চিকিৎসায় অবহেলা করছে না সেটা বলা যাবে না। আমাদের স্বাস্থ্য-অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছে চিকিৎসকগণ।

এ থেকে অতি সত্তর উত্তরণের প্রয়োজন! আমলাতন্ত্র থেকে বের হয়ে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে যেন বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণ সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং চিকিৎসকগণ চিকিৎসা পেশা হতে মুখ ফিরিয়ে অন্য পেশায় বা অন্য দেশে চলে না যান।

লেখক: মো. মারুফ হক খান, এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমএসসি, পিএইচডি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ