দেড় যুগ পর মন্ত্রী পাচ্ছে নারায়ণগঞ্জবাসী

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০১৯ | আপডেট: ৫:০০:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০১৯
পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্ব পাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক। ছবি: সংগৃহীত

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মত শপথ নেয়ার পর নতুন মন্ত্রীপরিষদে ব্যাপক রদবদল নিয়ে আসছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন কারণে একের পর এক চমক দিয়ে মন্ত্রীসভায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নাম। তারুণ্য নির্ভর নতুন মন্ত্রীসভা গড়তেই যেন এমন রদবদল!

আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ থেকে কাউকে মন্ত্রীত্ব দেয়া হলো। আর নারায়ণগঞ্জ থেকে আবারও কোনও সংসদ সদস্য মন্ত্রীত্ব পেলেন দীর্ঘ দেড় যুগ পর। সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক। তাকে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব দেয়া হয়েছে।

বিষয়টি কেন্দ্র থেকে ফোন করে জানিয়ে মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য বলা হয়েছে, এই মর্মে তার ছেলে গোলাম মর্তুজা পাপ্পা রোববার (০৬ জানুয়ারি) সকালে তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বিকেলে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে গাজীর মন্ত্রীত্ব পাবার বিষয়টি প্রচার করা হয়েছে। আগামী ৭ জানুয়ারি সোমবার বিকেলে মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ করার কথা রয়েছে।

তবে নারায়ণগঞ্জে মন্ত্রীত্ব নিয়ে যাকে নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, তার ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত না আসায় জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে মহাজোট প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর মন্ত্রীত্ব নিয়ে আলোচনায় আসে দেশের আলোচিত রাজীনিতিবীদ শামীম ওসমানের নাম।

গোলাম দস্তগীর গাজী ২০০৮, ২০১৪ ও সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭শ’ ৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও নির্বাচনের আগে তার মনোনয়ন নিয়ে ছিল নানা নাটকীয়তা।

এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের বর্তমান ক্ষমতানসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এদের মধ্যে দুইজন হ্যাট্টিক বিজয় অর্জন করেছেন। তারা হলেন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী এবং নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু। একই সাথে অন্য তিনজন টানা দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

তারা হলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে লিয়াকত হোসেন খোকা, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে সেলিম ওসমান। তবে শামীম ওসমান এর আগে ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে দুইবার এমপি নির্বাচিন হয়েছিলেন। প্রতিবারের মতো এবারো আওয়ামী লীগের তিনজনকে ঘিরে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী পরিষদে জায়গা নিয়ে আলাপ আলোচনায় সরগরম হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ।

রাজনৈতিক বিভিন্ন সূত্র বলছে, রাজধানীর সবচেয়ে নিকটবর্তী জেলা নারায়ণঞ্জ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার অবদান অবদান কোনও অংশেই কম ছিল না। ফলে সব সরকারই রাজনৈতিক বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জকে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (আওয়ামী লীগ) সরকারের সময় ১৯৭৩ এর নির্বাচনে এমপি হয়েছিল শামীম ওসমানের বাবা ভাষা সৈনিক একেএম সামসুজ্জোহা। সত্তর দশকের শেষের দিকে জিয়াউর রহমানের (বিএনপি) শাসনামলে নারায়ণগঞ্জ থেকে এম এ সাত্তারকে পাটমন্ত্রী করা হয়। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের এমপি ছিলেন।

এম এ সাত্তারকে মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসী প্রথম মন্ত্রীত্বের স্বাদ পায়। আশির দশকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের (জাতীয় পার্টি) শাসনামলে সোনারগাঁয়ের আ ন ম বাহাউল হককে উপ-মন্ত্রীর পদমর্যায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়। ফলে তখন প্রথম উপমন্ত্রীরও স্বাদ পেল নারায়ণগঞ্জবাসী। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ-১ আসেনর এমপি আব্দুল মতিন চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। তাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসীর মুখ উজ্জল হয়ে উঠে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। তবে সে সময় নারায়ণগঞ্জবাসীর ভাগ্যে মন্ত্রী জোটেনি। ২০০১ সালে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তখন আব্দুল মতিন চৌধুরীকে বস্ত্রমন্ত্রী করা হয়। একই সাথে সোনারগাঁও আসন থেকে নির্বাচিত এমপি অধ্যাপক রেজাউল করিমকেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করা হয়। একই জেলায় দুইজনকে মন্ত্রী করার কারণে আরেক ধাপ নারায়ণগঞ্জবাসীর মুখ উজ্জল হয়।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বিএনপির নেতা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে বিআরটিসির চেয়ারম্যান করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারই তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ তিনটি ও তাদের শরিক জাতীয় পার্টি দু’টি আসনে এমপি নির্বাচিত হয়। কিন্তু সে সময়ের মন্ত্রীসভায় স্থান পায়নি নারায়ণগঞ্জ।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর সরকারের মন্ত্রীসভায় নারায়ণগঞ্জকে রাখা হচ্ছে কি না, সে বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে আসে। তবে সে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তবে জাতীয় রাজনীতিতে আশির দশক থেকে যার অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, সেই শামীম ওসমানকে এবার মন্ত্রীত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন জেলার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের তিনশ’ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন কাজ করেছিলেন। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সাত হাজার চারশ’ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করেন। দেশের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তাকে মন্ত্রীত্ব দেয়া হলে নারায়ণগঞ্জের চেহারা আরও পাল্টে যাবে বলে সবাই মনে করছেন।