ধর্মপাশার মধ্যনগর খাদ্যগুদামে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ অভিযান সম্পন্ন, কৃষকেরা হতাশ

মোঃ ইমাম হোসেন মোঃ ইমাম হোসেন

ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯ | আপডেট: ৯:০০:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯
সুনামগঞ্জ জেলা

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার শঙ্করানন্দ তালুকদার হাওরপাড়ের একজন সাধারণ কৃষক। সরকারি ন্যায্য মূল্যে ধান সংগ্রহ শুরু হলে তিনি ভেবেছিলেন সেই ধান খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারবেন। তিনি বারবার চেষ্টাও করেছেন। যোগাযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে। কিন্তু খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার ধান বিক্রি করার সুযোগ না দিয়ে তাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কাছে শঙ্করানন্দ তালুকদারের কৃষি কার্ডটি বিক্রি করে দিতে পরামর্শ দেন। ফলে শঙ্করানন্দ তালুকদার বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে তার কৃষি কার্ডটি বিক্রি করে দেন। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের বাখরপুর গ্রামের কৃষক শঙ্করানন্দ তালুকদারের মতো একই গ্রামের কৃষক শন্তপদ তালুকদার, রামকুমার তালুকদার, স্বপন তালুকদার, পিযুষ তালুকদারও খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে না পেরে তাদের কৃষি কার্ড ওই মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করেছেন।

ধর্মপাশা উপজেলার ১০ ইউনিয়নের কৃষকদের জন্য পৃথক দুইটি খাদ্যগুদাম রয়েছে। একটির অবস্থান ধর্মপাশা উপজেলা সদরে এবং অন্যটি উপজেলার মধ্যনগর থানা সদরে অবস্থিত। উপজেলা সদরের খাদ্যগুদামে ধর্মপাশা সদর ইউনিয়ন, সেলবরষ, পাইকুরাটি, সুখাইড়-রাজাপুর উত্তর ও সুখাইড়-রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার কথা। আর মধ্যনগর থানা সদর খাদ্যগুদামে মধ্যনগর সদর ইউনিয়ন, চামরদানি, বংশীকুন্ডা উত্তর, বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ও জয়শ্রী ইউনিয়নের কৃষকদের ধান সংগ্রহ করার কথা রয়েছে।

ধর্মপাশা খাদ্যগুদামে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় ১ হাজার ২০২ মেট্রিক টন ও মধ্যনগর খাদ্যগুদামে ১ হাজার ২৫৭ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারন করা হয়েছে ১০৪০ টাকা। প্রথমে ধান সংগ্রহের সময়সীমা ৩০ আগস্ট পর্যন্ত থাকলেও পরে আরও ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু মধ্যনগর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) অবিনাশ দাস চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যনগরে যোগদানের পরই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে তুলেন সিন্ডিকেট।

কৃষকেরা ধান বিক্রি করতে এলে তাদের ফিরিয়ে দিয়ে সিন্ডিকেটে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে কৃষি কার্ড বিক্রি করার পরামর্শ দেন। সিন্ডিকেটে জড়িত ব্যক্তিরা কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ধান বিক্রি করেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে টাকা ছাড় দেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা সেই টাকা উত্তোলন করে ভোগ করেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মধ্যনগর খাদ্যগুদামে সরোজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাদ্যগুদামের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। আগামী রোববার ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের শেষ দিন হলেও খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের কোনো ব্যস্ততা নেই। যদিও ধর্মপাশা খাদ্যগুদামে রয়েছে ধান সংগ্রহের বিরাট ব্যস্ততা। এ সময় দেখা হয় বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চাপাইতি গ্রামের বাসিন্দা জহুর উদ্দিনের সাথে। তিনি জানান, তার ভাই ও ভাতিজাদের প্রতিনিধি হিসেবে কবে তাদের ধান সংগ্রহ করা হবে তা জানতে গত ২০ দিন ধরে তিনি খাদ্যগুদামে আসছেন। কিন্তু খাদ্যগুদাদের কর্মকর্তা তার সাথে অশালীন আচরণ করেন এবং ধান নিচ্ছি নিবো করে সময় ক্ষ্যাপন করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্যগুদাম সংলগ্ন কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন গত ৩০ আগস্টের পর থেকেই বন্ধ রয়েছে মধ্যনগর খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম। ৩০ আগস্টের মধ্যেই মোট বরাদ্দের ধান সংগ্রহ হয়ে গেছে। এখন শুধু কাগজপত্র গোছানের কাজ চলছে খাদ্যগুদামে। তাই মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা এখনও কৃষি কার্ডের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

জয়শ্রী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছিলেন তাদের ধান নেওয়া হচ্ছে না। আমি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে এ নিয়ে ফোনে কথা বলেছিলাম। কিন্তু কবে ধান নেওয়া হবে তার কোনো সদোত্তর পাইনি।’

নিয়ম মাফিক ধান সংগ্রহ হয়নি এবং কাউকে কার্ড বিক্রি করতে পরামর্শ দেননি জানিয়ে মধ্যনগর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) অবিনাশ দাস বলেন, ‘চতুর্মূখী চাপে আছি। নির্মাণাধীন ভবনে ধান মজুদ করার কোনো নিয়ম না থাকলেও কৃষকের সুবিধার্থে সেখানে ধান মজুদ করা হয়েছে। অগ্রীম কোনো ধান সংগ্রহ করা হয়নি। স্ব স্ব কার্ডধারীরাই যে বিল নিয়েছে তা বলা যাবে না। একজনের পক্ষে অন্যজন বিল নিয়েছেন।’

ধর্মপাশা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা তাহিরপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মধ্যনগর খাদ্যগুদামে ৭৫ টন ধান সংগ্রহ বাকি আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ শেষ হবে। মূল গুদামে জায়গা না থাকায় নির্মাণাধীন ভবনে ধান রাখা হয়েছে। কৃষকের কার্ড অন্য কেউ নিলেও ব্যাংক থেকে কৃষক ছাড়া টাকা তোলা সম্ভব নয়। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, ‘তালিকায় নাম থাকলে কৃষকের ধান নেওয়ার কথা। আর কৃষকের ধান নেওয়া হয়নি বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে খোঁজ নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সাথেও কথা বলতে পারেন।