‘নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ না করে মরবো না’

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮ | আপডেট: ৩:১৪:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮

ভারতে অবৈধ নাগরিক হিসেবে ঘোষিত আসাম রাজ্যের এক হাজারের মত তথাকথিত বহিরাগত বা অনুপ্রবেশকারীকে বিভিন্ন আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তারা কেমন জীবন যাপন করছে তা নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদন, ‘India Assam: ‘I won’t die before I prove my Indian citizenship’

গত তিন মাস ধরে আসাম রাজ্যের সিলচরের এক আটককেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৩৩ বছরের অজিত দাস। গত ৩ মাসে তিনি একবারের জন্যও বাইরে আসার সুযোগ পাননি। কয়েক সপ্তাহ আগে চার বছরের কন্যার দেখভালে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য জামিন পেয়েছেন তিনি। আটক হওয়ার কারণে তার চাকরি গেছে, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে স্বামীকে সপ্তাহে সপ্তাহে দেখতে যাওয়ার কারণে গত কয়েক মাসে নিজেদের সমস্ত সঞ্চয় খুইয়েছেন তার স্ত্রী।

অজিত বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আমার ৫ কেজি ওজন কমেছে। সেখানকার খাবার তো অখাদ্য, ওগুলো মুখে দেয়া যায় না। বেশিরভাগ সময়ই আধা সিদ্ধ খাবার খেতে দেয়া হত আমাদের।’

আসামের বিশেষ আদালত অজিত দাসকে বাংলাদেশ থেকে আগত অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করার পরই তাকে আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়। ১৯৮৫ সাল থেকে এসব বিশেষ আদালতে ৮৫ হাজার লোকের শুনানি হয়েছে। ওইসব শুনানিতে ১ হাজার জনকে ভারতে বহিরাগত ঘোষনা করার পর ছয়টি আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সরকার এখনও বাকি মামলাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।

অজিত দাস বলেন, তারা পরিবার ভারত এসছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন তার বাবা-মা। ভারতেই তার জন্ম। কিন্তু আদালত তাকে ‘সন্দেহপূর্ণ ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কেননা তিনি আদালতের কাছে উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তবে তার স্ত্রী ভারতীয় নাগরিক। যদিও তার দুই ছেলেমেয়ে অবৈধ নাগরিকের তালিকাতেই পড়বে। নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণের জন্য এই দম্পতি একজন আইনজীবী নিয়েছেন। কিন্তুেএজন্য তাকে ফি হিসেবে প্রচুর অনেক টাকা দিতে হচ্ছে।

এখন ভারতের ওই নাগরিক তালিকায় যাদের নাম আসেনি তারা আপিল করতে পারবেন। যদিও এটি খুব সময় সাপেক্ষ বিষয়, কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা অব্দি অজিত রায় এবং তার মত যারা অনুপ্রবেশকারী তাদের এভাবেই চরম হাতাশ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

চলতি মাসের গোড়ার দিকে আসাম সরকার যে নাগরিক তালিকা বা এনসিআরএ প্রকাশ করেছে সেখানেও বাদ পড়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের নাম। এতে পরিস্থতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। যদিও মোদি সরকার বার বার বলেছেন, যাদের নাম নেই তাদের কাউকেই ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে না। এমনকি সম্প্রতি নেপালে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও এই বলে আশ্বস্ত করেছেন যে, আসাম থেকে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে না।

তবে ভয় পাচ্ছেন অজিত দাস। তার আশঙ্কা, যে কোনো সময় তার জামিন বাতিল করে তাকে জোরপূর্বক শিবিরে পাঠানো হতে পারে। তিনি জানান, শিবিরটি আকারে বড় হলেও লাল রংয়ের দালানটি জেলখানার মতই দেখতে। আসামের সবক’টি আশ্রয় শিবিরই এমন। ছোট্ট একটা রুমে ৩৫ জন লোক থাকে। তারা গাদাগাদি করে বসে খায়। তারা একটা টয়লেট ব্যবহার করে যার কোনো ছিটকানি নেই। প্রতিদিন সকালে টয়লেটে যাওয়ার জন্য তাদের আধ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হয়।

লোকজনের চিল্লাচিল্লিতে সকাল ৫টায় তার ঘুম ভেঙে যায়। দ্রুত তৈরি হয়ে নেন। নইলে সকালের চা পানের সুযোগটা হাতছাড়া হতে পারে। চায়ের সঙ্গে সবার জন্য দুটা করে বিস্কুট বরাদ্দ। নাস্তা শেষে সবাই রুমের বাইরে একটা খোলা চত্বরে বসে থাকে, যা ৪০ ফুট উঁচু বেষ্টনি দিয়ে ঘেরা। দুপুরে ভাত, ডাল আর সব্জি। বিকাল ৫টার আগেই তাদের দুপুরের খাবার শেষ করতে হয়। কেননা ৬টার মধ্যে তাদের গারদে ঢুকতে হবে। এরপর বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হবে দরজা।

শিবিরের বাইরে দিনেমানে লোকজনের লম্বালাইন থাকে সবসময়। কেননা তাদের পরিবার পরিজন দেখা করতে আসে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রত্যেকের মাত্র ১০ মিনিট করে সময় বেধে দেয়া আছে। এরপর যারা না যায় তাদের লোহার ডাণ্ডা দিয়ে পিটিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়া হয়।

গত এক বছর আগে সিলাচন শিবিরে নেয়া হয়েছে মোহাম্মদ ইউনুসকে। প্রতি সপ্তাহে বাবার সঙ্গে দেখা করেন তিনি। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘ভোট দেয়া আর জমি কেনার অধিকার পেয়েও আমরা ভারতীয় হতে পারিনি। এখন আদালতে আমাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে।’

কেউ কেউ আবার কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এদেরই একজন সুচন্দ্রা গোস্বামী, পার্টটাইম গানের শিক্ষক। নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য তাকে আইনি নোটিশ দেয়া হয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু ওই নোটিশে তার নামের বানান ভুল থাকায় তিনি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি। কিন্ত ‍ু২০১৫ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়।

সুচন্দ্রা গোস্বামী বলেন, ‘নামের বানান ভুলের জন্য তিন দিন কারাগারে থাকে আমার কাছে বড় শাস্তি মনে হয়েছে। এতে আমার আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। জেলখানায় তিন রাত আমি শুধু কান্না করেছি।’ কেননা তাকে আশ্রয় শিবিরে নয়, কারাগারে নেয়া হয়েছিল।

অজিদ দাসকেও প্রথমে কারাগারেই নেয়া হয়েছিল, যেখানে খুনি বা ধর্ষকদের রাখা হয়। পরে এ নিয়ে অভিযোগ করা পর তাকে আশ্রয় শিবিরে সরিয়ে নেয়া হয়।

সম্প্রতি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এসব আশ্রয়শিবিরের অবস্থা জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার উভয়কেই চিঠি দিয়েছে। এ সম্পর্কে জেলা কর্মকর্তা এস লক্ষণ মেনন বিবিসিকে বলেন, ‘কিছু লোকজনকে (সন্দেহভাগ নাগরিক) সাধারণ কয়েদির সঙ্গে কারাগারে রাখা হয়েছে। তবে আমরা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আমরা তাদের জন্য বিনা মুল্যে চিকিৎসাসেবা দেব। আমরা সেখানে কর্মচারীর সংখ্যাও বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’

আশ্রয়শিবিরে আটক চন্দ্রাধর দাসের বয়স একশ’র উপরে। তিনি কারো সাহায্য ছাড়া একা একা হাঁটতেও পারে না। কিন্তু তারপরও তার নাম ‘সন্দেহভাজন ভারতীয় নাগরিক’ তালিকায় এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করেই ছাড়বো। এর আগে আমি মরবো না।’

সূত্র: বিবিসি