পশ্চিমবঙ্গ লেখকদের ‘হিংস্র’ বললেন তসলিমা

প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৮ | আপডেট: ৭:৪৩:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৮
তসলিমা নাসরিন। ফাইল ছবি

পশ্চিমবংগ প্রগতিশীলদের রাজ্য। ওখানকার কবি সাহিত্যিকদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি। এ কারণেই ইউরোপ/আমেরিকা থেকে প্রাণের টানে ছুটে গিয়েছিলাম কলকাতায়।

বাংলাদেশের সরকার প্রবেশের অধিকার দিচ্ছে না। সুতরাং কলকাতাকেই গ্রহণ করেছি নিজের শহর হিসেবে। কিশোর বয়স থেকে পশ্চিমবংগের ম্যাগাজিনে লিখি। ওখানকার তরুণ কবিরা আমার লিটল ম্যাগে লেখেন। সত্তর দশক থেকে ওপার বাংলার সঙ্গে আমার এমনই নিবিড় আত্মীয়তা।

কলকাতা ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও শহর আমার মতো বাঙালি লেখকের বসবাসের জন্য উপযুক্ত মনে হয়নি। প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন, স্টকহোম, রোম, নিউইয়র্ক, বোস্টন, লস এঞ্জেলেস– এরকম আরও অনেক শহরকে বাতিল করে বেছে নিয়েছিলাম কলকাতাকে, ২০০৪ সালে। প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা ছিল আমার। দু’বার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছি। প্রায়ই লেখা ছাপা হচ্ছে বড় পত্রিকায়, বড় প্রকাশনী বই ছাপাচ্ছে, বইমেলায় আমার বইয়ে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য পাঠকের লম্বা লাইন, আমাকে এক পলক দেখার জন্য সাধারণ মানুষের ভিড়, ভিড় ঠেকাতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হতো। সেই প্রিয় কলকাতায় হঠাৎ আমি ব্রাত্য।

পর পর তিনটি ঘটনা ঘটলো — আমার বই নিষিদ্ধ করা হলো, আমাকে গৃহবন্দি করা হলো, আমাকে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হলো। সবটাই রাজনীতিকদের কাজ নয়। পশ্চিমবঙ্গের কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাও এতে বিশাল।

আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি পৃথিবীর অনেক ভাষায় বেরিয়েছে। সব খানেই বইটি প্রশংসিত হয়েছে। আমার লেখা ৪৫টি বইয়ের মধ্যে যে ৫টি বইকে আমি বেস্ট বলবো,সেই ৫টির মধ্যে দ্বিখণ্ডিত একটি। আজকের #মিটু আন্দোলনকে স্বাগত জানাবে, অথচ বিখ্যাত এক পুরুষের যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে বলে দ্বিখণ্ডিতকে গালি দেবে — এ হিপোক্রেসি ছাড়া কিছু নয়। নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি বলবে, কিন্তু দ্বিখন্ডিতয় একটি মেয়ে কারো যৌন দাসী হতে চায়নি, বরং যৌনতা শুধু পুরুষের নয় যৌনতা নারীরও অধিকার এ কথা বিশ্বাস ক’রে পছন্দের পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেছে — কত বড় হিপোক্রেট হলে আত্মজীবনীতে এর উল্লেখ সহ্য করতে পারে না! পশ্চিমবংগের বড় বড় লেখক কেমন উঠে পড়ে লেগেছিলেন আমার বই নিষিদ্ধ করার জন্য, ভাবলে শিউরে উঠি। লেখকেরা বই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন, সারা পৃথিবীতে তাই ঘটে। কিন্তু পশ্চিমবংগে উলটো। লেখক, বুদ্ধিজীবীরা আমার বই নিষিদ্ধ করার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একটি বই লিখেছেন, ক্ষমতায় থাকা কালীন নিজে কী কী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, উল্লেখ করেছেন। আশ্চর্য একটি বই নিষিদ্ধ করে, একজন সত্যিকারের সেকুলার লেখককে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে ভুল করেছিলেন বলেন নি। ভালো মানুষেরা অনুতপ্ত হয়। ভালো মানুষ পশ্চিমবংগে কোথায়? দ্বিখণ্ডিত বইটি মূলত মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার, আর মানবতার পক্ষের একটি বই। বাংলাদেশের সবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম আনার বিরুদ্ধে বলেছিলাম, দেশকে ইসলামীকরণের প্রতিবাদ করেছিলাম, সেটি পশ্চিমবংগের প্রগতিশীল লেখকদের সহ্য হয়নি।

পশ্চিমবংগের সাহিত্যিকদের মধ্যে এথিক্স বলে হয়তো এককালে, তিরিশ বা চল্লিশের দশকে, কিছু ছিল। এখন সরকারের চাটুকারিতা করা সে যে সরকারই আসুক, বড় কোনও একাডেমিতে বড় কোনও পোস্ট, নানা রকম সরকারি পুরস্কার, সুযোগ সুবিধে টাকা পয়সা অঢেল পেয়ে পাওয়ার লোভ প্রচন্ড। এই সব পাওয়ার জন্য যত মিথ্যে কথা তাঁদের বলা দরকার বলবেন, এ কারণে কারও বই নিষিদ্ধ করার জন্য রাস্তায় নামার দরকার হলে রাস্তায় নামবেন, কুৎসা রটনা করার দরকার হলে কুৎসা রটাবেন, কারো মুখে কালি লেপার দরকার হলে লেপবেন, চরিত্র হনন করার দরকার হলে করবেন, বাংলাদেশের তসলিমা-বিরোধী সমাজে বই বিক্রি করার জন্য তসলিমার বিরুদ্ধে নোংরা নিকৃষ্ট কথা বলতে হলে বলবে্ন। সবই করেছেন এবং এখনও তাঁরা মহান লেখক হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যাচ্ছেন।

তসলিমাকে পশ্চিমবংগে ব্ল্যাক আউট করার ইচ্ছে তাঁদের ছিল, তাঁরা সফল। বড় পত্রিকায় তসলিমার লেখা ছাপানো বন্ধ, বড় প্রকাশনী থেকে তসলিমার বই প্রকাশ বন্ধ, পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার পা ফেলা নিষেধ। আর কী চাই!

বাক স্বাধীনতার বিপক্ষে, মত প্রকাশের অধিকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমবংগের লেখক কবি শিল্পী সাহিত্যিকরা কী ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠতে পারেন, দেখুন। এঁদের মুখোশ খসে পড়েছিল সেদিন।