পাঠক খরায় ভুগছে কুমিল্লার পাঠাগারগুলো

প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০১৯ | আপডেট: ২:৪৫:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০১৯
ছবি:টিবিটি

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার প্রাচীন গ্রন্থাগারের মধ্যে রয়েছে রামমালা গ্রান্থাগার, যা এখন বন্ধ প্রায়। ১৯১২ সালে মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ঈশ^র পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯১৯ সালে শুরু করেন রামমালা গ্রন্থাগার।

বর্তমানে সংস্কৃত, বাংলা, জ্যোতিবিদ্যা, আযুর্বেদ, চিকিৎসাশাস্ত্রের পুঁথিসহ রয়েছে ২০ হাজারের বেশী দুষ্পাপ্য পুঁথি সংগ্রহশালা। লেখক ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া মনে করেন, বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মত জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এ পাঠাগারের মতো প্রাচীন পুঁথির সংগ্রহশালা নেই। মাঝে মাঝে বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকরা আসেন এ পাঠাগারে। গ্রন্থাগারিক ইন্দ্রকুমার সিংহ জানান, ইতোমধ্যে অনেক পুঁথি নষ্ট হয়ে গেছে, সময় থাকতে যতœ না নিলে পাঠাগারটি তার ঐতিহ্য হারাবে।

তিনি আরো জানান, মানুষ এখন আগের মতো বই পড়ে না, এখন এ পাঠাগার পাঠক শূন্য। বীরচন্দ্র নগর গণপাঠাগার ১৮৮৫ সালে রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য প্রতিষ্ঠা করেন গণ-পাঠাগার ও নগর মিলনায়তন। এ পাঠাগারে বই সংখ্যা ২৫ হাজার প্রায়। আজীবন সদস্য ১৪ জন, সাধারণ সদস্য ৯০০ জন রয়েছে। সহকারি গ্রন্থাগারিক মাকসুদুর রহমান জানান, পত্রিকার গড় পাঠক দৈনিক ৫০০ জন। বইয়ের গড় পাঠক ৫ জন।

আর নতুন পাঠক তৈরি হচ্ছে না। অল্প সংখ্যক তরুণরাই পাঠাগারে আসে। বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কুমিল্লা শহরের ৩৪ টি স্পটে মাসে ১০ টাকা চাঁদার বিনিময়ে পাঠকদের জন্য বই সেবা দিয়ে থাকে। তাদের বই সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। সাধারণ ও বিশেষ সদস্য ৫৬৭৮ জন।

অনুমানিক গড় পাঠক ৭০-৮০ জন। এ তথ্য দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজের বিভাগ ভিত্তিক বিভিন্ন সেমিনারে খবর নিয়ে জানা যায়, পাঠক সংখ্যা খুবই কম, যারা আসেন পরীক্ষার পড়া ,চাকুরি ও বিসিএস প্রস্তুতির জন্য মাঝে মাঝে আসেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রীয় পাঠাগারে রয়েছে মেডিকেল ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ১০ হাজারের ও অধিক বই। দেশী-বিদেশী স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। এখানে দৈনিক ৮০- ১০০জন পাঠক রয়েছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ ডা. মো:মহসিন-উজ-জামান চৌধুরী জানান, এটা অত্যাধুনিক পাঠাগার, পাঠকদের কথা চিন্তা করে সবোর্চ্চ গতির ইন্টারনেট রয়েছে। পরামর্শ খাতা রয়েছে পাঠক যদি কোন বই এখানে না পায় পরামর্শ খাতায় বইয়ের নাম, লেখক ও প্রকাশনীর নাম লিখে দেন, আমরা তা সংগ্রহ করি। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট গ্রন্থাগার বিভাগে কাজী নজরুল ইসলামের বইসহ প্রায় ১১ হাজার বই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ পাঠাগারের পাঠক গড় ৩ জন মাত্র।

কুমিল্লার টিআইবি ও সনাক, শিল্পকলা একাডেমি , কারাগার, ডিসি অফিস, শিশু একাডেমি লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার রয়েছে। এসব পাঠাগারেও তেমন পাঠক দেখা যায়না। বাসা বাড়ি ও অফিসে বই দিয়ে শুধু কক্ষ সাজাতেই অনেকে ভালোবাসেন।এ বিষয়ে তরুণ লেখক সীমান্ত আকরাম, ফাহিম সব্যসাচী, জাহিদ হাসান ও সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পাঠাগারে ওয়াইফাই সুবিধা রাখা যেতে পারে।

পাঠাগার এমন যায়গায় হবে যাতে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো থাকতে হবে। নবীন প্রবীণ পাঠকদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। গ্রুপ স্টাডির জন্য পৃথক কক্ষ রাখতে হবে। কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। বই পড়ার আগ্রহ পরিবার থেকে অভ্যাস চালু করতে হবে। পারিবারিক পাঠাগার চালু করা যেতে পারে।

তরুণদের বই পড়ায় আগ্রহী করতে কাজ করছে ফেসবুক গ্রুপ কুমিল্লার বই পোকাদের আড্ডা। এ গ্রুপের অন্যতম উদ্যোক্তা তুহিন মাজহার মনে করেন, বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। বই বিক্রয় কেন্দ্র সুলভ মূল্যে ¯œ্যাকের ব্যবস্থা। পাঠক ক্যাম্পেইন, প্রতিযোগিতা , আড্ডা ও বিশেষ দিনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে পাঠক বৃদ্ধি পাবে।

আধ্যাপক আবুল খায়ের টিটু স্মৃতিচারণ করে বলেন, লন্ডনে থাকা অবস্থায় দেখেছেন,যখন ইন্টারনেটের সময় আসলো তখন পাঠাগারগুলো যুগোপযোগী করা হলো। ফটোকপি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, ওয়াইফাই ফ্রি করা হয়েছে।

সে হিসাবে বাংলাদেশের পাঠাগারগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। কুমিল্লা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রধান মোঃ কামরুল হাসান জানান, আমাদের এখানে ৪৩ হাজার পুস্তক রয়েছে। মডেল লাইব্রেরি করার লক্ষে লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড প্রকল্প চালু করা হয়েছে। দৈনিক ১৩টিসহ সাপ্তাহিক মাসিক ম্যাগাজিন রাখা হয়।

আমাদের এখানে ধার(বাড়িতে নিয়ে পড়া) মেম্বার আছে ১০৫ জন, ইন্টারনেট মেম্বার আছে ২০ জন। গড় পাঠক ১৩০ জন। এছাড়াও এখান থেকে জেলার ২৫টি বেসরকারি পাঠাগারের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয়।