বাড়ির ছাদে ‘স্পিরুলিনা’র চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৮ | আপডেট: ১২:০৫:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৮

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ভেষজ শৈবাল ‘স্পিরুলিনা’ চাষে শতভাগ সফল হয়েছে বলে দাবি করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক। থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করে জলাশয়ে এই সামুদ্রিক শৈবাল চাষের নজির থাকলেও ছাদে চাষ পদ্ধতি প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক। শেকৃবির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ফ ম জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে এক বছর গবেষণা করে এ সফলতা পেয়েছেন গবেষকরা। গবেষণা দলের সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ওসমান গনি নয়ন, মো. আসিফ ও নেপালি শিক্ষার্থী অনিল কুমার মহন্ত।

স্পিরুলিনা এক ধরনের অতিক্ষুদ্র নীলাভ সবুজ শৈবাল। এটি সামুদ্রিক শৈবাল নামেই বেশি পরিচিতি। সূর্যালোকের মাধ্যমে শৈবালটি প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে। এর বৈজ্ঞানিক নাম আর্থোস্পিরা ম্যাক্সিমা। বর্তমানে বিশ্বে কৃত্রিম জলাধারে এর বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। স্পিরুলিনায় প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ ও একাধিক খনিজ পদার্থ রয়েছে। সব ধরনের পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ হওয়ায় স্পিরুলিনা ‘সুপারফুড’ নামে পরিচিত। অনেকে স্পিরুলিনাকে ‘মিরাকল ফুড’ও বলে থাকেন। স্পিরুলিনা স্বাদবিহীন শক্তিবর্ধক সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নানা রোগনিরাময়ে মূল্যবান ভেষজ হিসেবেও এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, স্পিরুলিনা নিয়মিত সেবনে পুষ্টিহীনতা, রক্তশূন্যতা, রাতকানা, ডায়াবেটিস, মহিলাদের বন্ধ্যত্ব, উচ্চরক্তচাপ, আলসার, বাত, হেপাটাইটিস ও ক্লান্তি দূর হয়। তা ছাড়া আর্সেনিকোসিসের উত্তম প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে এটা। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে (২০০৮) সালে বিশ্বে পুষ্টিহীনতা দূর করতে স্পিরুলিনা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।

ড. আ ফ ম জামাল উদ্দিন বলেন, চলতি বছরে থাইল্যান্ডের এনারগিয়া ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে স্পিরুলিনা পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ শুরু হয়। কৃষির ওপর একটি সেমিনারে যোগ দিতে তিন বছর আগে হোটেল রেডিসনে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম থাইল্যান্ড থেকে আসা এক ভদ্রলোক স্পিরুলিনার ওপর বক্তব্য দিচ্ছেন। তখন বাংলাদেশে স্পিরুলিনা চাষে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি। পরে থাইল্যান্ড থেকে ৫০০ গ্রাম স্পিরুলিনা এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদ ভবনের ছাদে ড্রামে চাষাবাদ শুরু করি। বাংলাদেশের আবহাওয়া স্পিরুলিনা চাষের উপযুক্ত।

নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চার ফুট উচ্চতা এবং তিন ফুট ব্যাসসম্পন্ন আটটি ইউনিটে বিভক্ত করে প্রতিটি ইউনিটে ১৬টি ফুড গ্রেডেড ড্রাম ব্যবহার করেছি আমরা। প্রত্যকটি ড্রামে ২৭৫ লিটার পানি রেখে এবং সেই পানিতে সোডিয়াম বাই কার্বোনেট, ইউরিয়া, মিউরেট অব ম্যাগনেশিয়াম সালফেট একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে দ্রবণ প্রস্তুত করা হয়েছে। এই দ্রবণ থেকে স্পিরুলিনা সব প্রয়োজনীয় খাবার নিতে পারবে। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য নল দ্বারা বাইরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। ড্রামের ভেতরে পানি সমুদ্রের মতো চলমান রাখার জন্য ব্লোয়ার মেশিন ব্যবহার করেছি অমরা। তবে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে ড্রামের প্রত্যকটি ইউনিটকে পাইপ দিয়ে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায়। নাইট্রোজেনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইউরিয়া স্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তিতে দেশি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় খরচও কম হয়েছে। সূর্যের তাপমাত্রার বিকল্প হিসেবে এলইডি লাইট ব্যবহার করা যাবে বলে জানান এ গবেষক।

অধ্যাপক ড. জামাল বলেন, ১০০ গ্রাম স্পিরুলিনা থেকে ৩৭৪ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় এবং এর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই প্রোটিন। এ ছাড়া এতে উচ্চমাত্রায় লৌহ, পটাশিয়াম, জিংক ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। শর্করা একেবারেই কম মাত্রায় থাকে বলে ওজন কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া রয়েছে ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’ ও ‘অ্যান্টি-এজিং’ উপাদান। উচ্চমাত্রায় প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম থাকায় এটি শিশুদের হাড় ও মস্তিকের পরিপক্বতায় ভূমিকা রাখে। চুল পড়া বন্ধ হয়ে যায়। স্পিরুলিনা শুকিয়ে গুঁড়া করে সালাদ, নুডুলস, শাকসবজি, ফালুদা, শরবত ও জুসে মিশিয়ে খাওয়া যাবে। স্পিরুলিনা চাষ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন ফিউচার ফুড হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন গবেষকরা।

গবেষকদের মতে, সূর্যের আলোতে এবং অধিক তাপমাত্রায় স্পিরুলিনা ভালো জন্মে। তাই এটি চাষের জন্য বাড়ির ছাদ উত্তম জায়গা। তবে দৈনিক সাত থেকে আট ঘন্টা সূর্যের আলো পর্যাপ্ত থাকে বাড়ির এমন জায়গায় এর চাষ করা যাবে। সূর্যের আলো ছাড়া এর উৎপাদনে গবেষণা চালছে বলে জানান তারা। এক্ষেত্রে সূর্যেও আলোর পরিবর্তে কৃত্রিমভাবে আলো সরবার করা হচ্ছে।