মুজিববর্ষে প্রধান মন্ত্রীর বিনামূল্যে বাড়ি উপহার পৃথিবীতে এক অনন্য নজির

মোঃ হায়দার আলী মোঃ হায়দার আলী

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২১ | আপডেট: ৫:০৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২১

মোঃ হায়দার আলীঃ করোনা ভাইরাসে কাহিল, গতিচ্যুত গোটা বিশ্ব, বাংলাদেশ এর প্রভাবে ক্ষত বিক্ষত। এর মধ্যে দেশবাসী করোনায় ঈদুল ফিতরে কোনভাবে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে এলাকার মসজিদে মসজিদে দুই বা ততোধিক জামাত করে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।

নতুন পোশাক, কোলাকোলি, হ্যান্ডসিপ, ঘোরাঘোরি প্রভূতি কাজগুলি করতে হয়েছে সামাজিক দুরুত্ব মেনে। তাড়াতাড়ি নিজ বাড়ীতে গিয়ে অবস্থান করেছেন। এ যেন ইতিহাসের স্মরণ কালের করোনার ঈদুল ফিতর। এমন ঈদ যেন আগামীতে কারো জীবনে না আসে এটা প্রত্যশা সবার। ইদুল আজহায় কি একইভাবে মসজিদে পালন করতে হবে।

সে যাই হউক কি বিষয়ে লিখব, তা চিন্তা করছিলাম, কিন্তু টেলিভিশন, পত্র পত্রিকায়, অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম প্রধান মন্ত্রীর স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সভায় ৫টি তদন্ত দল গঠন করে অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ত্রুটিপূর্ণ ঘরের জন্য দায়ী এবং দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড়া দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তাই তো লেখার থিম পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে বাড়ি পেয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন হাজার হাজার পরিবার এ সম্পর্কে আল্লাহর নাম নিয়ে লিখা শুরু করলাম।

আসলে বাসা (house) হচ্ছে অস্থায়ী আবাস আর বাড়ি (home) হচ্ছে স্থায়ী আবাস । আপনি যদি শহরে ভাড়া থাকেন তবে এটি আপনার বাসা । কারণ এটি অস্থায়ী । আবার আপনার যদি গ্রামে নিজেদের ঘরবাড়ি থাকে তাহলে ওইটা হচ্ছে আপনাদের বাড়ি ।

তবে বাসা এবং বাড়ি একই জিনিস হতে পারে । মনে করুন, আপনি যেখানে ভাড়া আছেন সেটি আপনার জন্য অস্থায়ী সুতরাং সেটি আপনার জন্য বাসা । আবার ওই বাড়িটির যিনি মালিক তার জন্য সেটি কিন্তু স্থায়ী । তাই আপনার বাসাটিই ওই মালিকের জন্য বাড়ি। কারণ মালিক আপনাকে যেকোন সময় তুলে দিতে পারে এবং নিজেও ওই বাড়িটি ব্যবহার করতে পারে ।

ঠিক একই কারণে আমরা সব সময় পাখিদের ক্ষেত্রে বাসা বলি বাড়ি বলি না। কারণ পাখিদের আবাসস্থল অস্থায়ী। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে তাদের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা তাদেরকে তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করতে হতে পারে। তাদের স্থায়ী কোনো আবাসস্থল নেই। এজন্যই আমরা পাখিদের ক্ষেত্রে সব সময় বাসা বলি ।

বাড়ী, বাসা, গৃহ যে নামেই ডাকা হউক না যে, দেশের অনেক মানুষের থাকার তেমন জায়গা নেই, তারা রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয় কোনভাবে বসবাস করেন। একটু জমি, মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই কে না চাই।

তাদের কথা চিন্তা করে মুজিব বর্ষে দেশের একটি মানুষও গৃহহীন বা ভূমিহীন থাকবে না বলে গত বছরের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর এই মহান ও মানবিক ঘোষণা বাস্তবায়নে মুজিববর্ষে প্রত্যেক গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারকে দুর্যোগ সহনীয় সেমিপাকা ঘর এবং দুই শতাংশ জমির মালিকানা দেয়ার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প নেয়া হয়।

মুজিববর্ষে গৃহ ও ভূমিহীনদের প্রত্যেককে ঘর ও জমি দেয়ার উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মহৎ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার জেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। তদানীন্তন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ মে ঐ এলাকা পরিদর্শনে যান। তিনি মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন এবং সকল গৃহহীন পরিবারসমূহকে পুনর্বাসনের তাৎক্ষনিক নির্দেশ দেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে “আশ্রয়ণ” নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিন (০৩) টি ফেইজে আশ্রয়ণ প্রকল্প (৯১৯৭ – ২০০২), আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ – ২) (২০০২ – ২০১০), আশ্রয়ণ – ২ প্রকল্প (২০১০ – ২০২২) মোট ৩১৯,১৪০টি পরিবার পুনর্বাসন করা হয়, তন্মধ্যে আশ্রয়ণ – ২ প্রকল্পের মাধ্যমে ২১৩,২২৭টি পরিবার পুনর্বাসন করা হয়েছে। বর্ণিত প্রকল্পের সাফল্য ও ধারাবাহিকতায় ২০১০-২০২২ (সংশোধিত) মেয়াদে ২.৫০ লক্ষ ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল পরিবার পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

পুনর্বাসিত ভূমিহীন, গৃহহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও ছিন্নমূল পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে ভূমির মালিকানা স্বত্বের দলিল/কবুলিয়ত সম্পাদন, রেজিষ্ট্রি ও নামজারী করে দেয়া হয়। পুনর্বাসিত পরিবার সমূহের জন্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণ, কবর স্থান, পুকুর ও গবাদি পশু প্রতিপালনের জন্য সাধারণ জমির ব্যবস্থা করা হয়। পুনর্বাসিত পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কর্মকান্ডের জন্য ব্যবহারিক ও কারিগরী প্রশিক্ষণ দান এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়। প্রকল্পগ্রামে বসবাসরত উপকারভোগীদের (যেমন: নাম/স্বামীর নাম, সন্তান সংখ্যা, ঋণ ইত্যাদি) এবং প্রকল্পগ্রামের তথ্য সংরক্ষণ করার জন্য ডাটাবেইজ প্রণয়ন করা হচ্ছে।

মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে বাড়ি পেয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন হাজার হাজার পরিবার। নিজস্ব ঠিকানা ও আশ্রয় পাওয়ার জন্য তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও ঘর প্রদান উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও ঘর প্রদান করা হয়। সরকার মুজিব বর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের জন্য ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এ বাড়িগুলো নির্মাণ করেছে।

একই সঙ্গে ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন আশ্রয়ণ প্রকল্প মুজিব বর্ষ উদ্‌যাপনকালে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি প্রকল্পের অধীনে ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রামের পারভীন। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। আমি জীবনে কখনো এমন বাড়ি বানাতে পারিনি।’ কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে পারভীন আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর কোনো কাজ নাই। আমাদের প্রায়ই না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। আমাদের কোনো বাড়ি ছিল না। কখনো ভাবিনি আমাদের একটা বাড়ি হবে। আপনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের একটি ঘর ও জমি দিয়েছেন। আপনি অনেক দিন বেঁচে থাকবেন।’

পারভীনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাঁদবেন না। আমি মনে করি এটা আমার দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে আমি জনগণের স্বপ্নপূরণ এবং দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না এবং আমি তা নিশ্চিত করব। একই সময়ে যাতে সকল মানুষ জীবন ও জীবিকার উপায় খুঁজে পেতে পারেন, আমি তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, আওয়ামী লীগ সবসময় মানুষের পাশে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের যে সংবিধান দিয়ে গেছেন সেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানে গৃহের অধিকার, শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আমরা মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

এ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জন গৃহহীন ও ভূমিহীনকে দুই কক্ষের ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। এসব ঘরের অনেকগুলোতে নির্মাণ ত্রুটি ধরা পড়েছে। ঘরের দেয়াল ও বারান্দার পিলারে ফাটল ধরেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ছে। টিনের ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাঠ ও উপকরণ। এরকম ৩০০ ঘর চিহ্নিত হয়েছে। অনেকে বিনামূল্যে ঘর পায়নি। স্থানীয় প্রভাবশালীদের টাকা দিয়ে ঘর পেতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে নানা ধরনের দুর্নীতি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ত্রুটিপূর্ণ ঘর চিহ্নিত করে তা সরকারি খরচে মেরামত বা পুনর্নিনির্মাণ করে দেয়া হবে বলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সভায় ৫টি তদন্ত দল গঠন করে অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ত্রুটিপূর্ণ ঘরের জন্য দায়ী এবং দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড়া দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

মুজিববর্ষে গৃহ ও ভূমিহীনদের প্রত্যেককে ঘর ও জমি দেয়ার উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মহৎ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য একটি কুচক্রী মহল প্রধান মন্ত্রীর বাড়া ভাতে ছাই কিংবা লাগিয়ে দেয়া আগুনে পেট্রোল ঢেলে দেয়ার অবস্থা করেছেন। যখন দেশের মানুষের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ কিছু অসৎ ও দুর্নীতিবাজের জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে দিন-রাত নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, সেখানে একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে তার সেই পরিশ্রম ব্যর্থ করে দিচ্ছে। তাদের এই অপকর্ম প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, চিন্তা-চেতনা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

শুধু এই আশ্রয়ণ প্রকল্পই নয়, সরকারের চলমান নানা উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়ম-দুর্নীতির খবর টিভি, জাতীয় পত্র-পত্রিকায়সহ অনলাইন প্রকাশিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের সকল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে প্রতিটি অর্থ খরচ করতে হয়। জনগণের প্রতিটি অর্থের মূল্য কত প্রধানমন্ত্রী তা জানেন। এ জন্য তিনি বরাবরই জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক থাকেন।

কোনো প্রকল্পে যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম না হয়, এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। সরকার প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করে দেয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের। সরকার আশা করে, দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতিটি প্রকল্প নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সাথে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করবে। দেখা যাচ্ছে, এমন কোনো প্রকল্প নেই যাতে অনিয়ম ও ত্রুটি-বিচ্যুতি হচ্ছে না। সময় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও তাতে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যাচ্ছে। নিম্নমানের হওয়ায় তা টেকসই হচ্ছে না। অল্প সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু করার পর তা সংশোধনের মাধ্যমে নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এতে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়। প্রকল্পের এই অর্থের জোগান আসে জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায়ের মাধ্যমে। দেখা যাচ্ছে, জনগণের অর্থ ব্যয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকলেও একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারি তা আমলে নিচ্ছে না। তারা তাদের স্বার্থে অর্থের অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’ প্রবণতা বিদ্যমান।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের মতো প্রধানমন্ত্রীর একটি আন্তরিক ও অতি প্রয়োজনীয় উদ্যোগকেও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাড়ছে না। যে প্রকল্পের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতির বিষয়টি জড়িয়ে আছে, সেই প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি করতে কিভাবে সাহস পায়, সেটাই প্রশ্ন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে তদন্ত কমিটি গঠন মানেই বিষয়টিকে ডিপ ফ্রিজে নিয়ে যাওয়া। শুরুতে তৎপরতা দেখা গেলেও দিন যাওয়ার সাথে সাথে তা থিতিয়ে পড়ে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম হওয়ার দায়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েক জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ওএসডি কোনো যথাযথ শাস্তি নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ নামকাওয়াস্তে নেয়া হয়। এতে ক্ষতিপূরণ হয় না। বরং দুর্নীতি ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তির পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিৎ। যাদের কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জমি-জমা বিক্রি করে ক্ষতি পূরণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে ১ লক্ষ, ২৩ হাজার হতদরিদ্র পরিবার ঘর পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত ২২টি জেলার ৩৬টি উপজেলা থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোট সংখ্যা হবে ৩৯টির মতো হবে সব মিলিয়ে। এই সবগুলোই তদন্তে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা, ইউএনও, এসিল্যান্ড, উপজেলা প্রকৌশলী এবং ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিনামূল্যে ঘর দেওয়া প্রকল্পের অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। ৩৬ উপজেলার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস জানিয়েছেন, এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের প্রকল্প, যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হবে সরকার। অভিযোগ আসা সবগুলো এলাকার রিরুদ্ধে তদন্ত শেষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব।

অবশ্য সরকার বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি-ঘর সরকারি অর্থে পুনরায় নির্মাণ করে দেয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অর্থ সরকার কোথা থেকে দেবে? সরকার যে অর্থ দেবে তা জনগণের। তাদের অর্থে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পুনরায় তাদেরই অর্থে মেরামত বা পুন:নির্মাণ করা হবে। এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই কঠোর ও উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

করোনাকালে যেখানে সরকার অসহায় দরিদ্রদের খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে একশ্রেণীর অসৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির অনিয়ম-দুর্নীতি এতটুকু বরদাশত করা যায় না। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত এবং অসততার মাধ্যমে মহতী প্রকল্প ব্যর্থ করে দেয়ার চক্রান্তে জড়িত, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: মো. হায়দার আলী, প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়।
সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা, রাজশাহী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)