বিরোধী দল সংসদে থাকুক জনগণ তা চায় না : রাঙ্গা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩, ২০১৯ | আপডেট: ৬:৩৩:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩, ২০১৯
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। ছবি: টিবিটি

৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন মহাজোট পেয়েছে। ২৮৮টিতেই মানুষ ভোট দিয়েছে মহাজোটের পক্ষে। সুতরাং আপনাদের ধরে নিতে হবে মানুষ বড় ধরণের কোনো বিরোধী দল চায় না জনগণ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় দলের প্রথম সভা শেষে এ মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় পার্টি মহাজোটের সঙ্গে থাকবে বলে জানিয়ে রাঙ্গা বলেন, জাপা মহাজোটে ছিল, আছে, থাকবে। এসময় তিনি দাবি করেন, জনগণ চায় না বিরোধী দল সংসদে থাকুক।

জাতীয় পার্টি মহাসচিব বলেন, সংসদে বিরোধী দল থাকুক, জনগণ তা চায় না।

মানুষ সরকারের ওপর সন্তুষ্ট বলেই মহাজোটকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জাপা মহাসচিব আরও বলেন, সরকার বা বিরোধী দল কোথাও থাকতে আমাদের আপত্তি নেই। আমাদের সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত এলাকার উন্নয়নের জন্য সবাই মহাজোটে থাকতে আগ্রহী।

এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নতুন সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

নতুন সরকারের অংশীদারিত্ব চায় না জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা

এদিকে জাতীয় পার্টির অধিকাংশ নেতাকর্মী চান না জাতীয় পার্টি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদ নিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের অংশীদারিত্ব করুক। তারা নিজেদের দলকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান।

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দ্বৈত অবস্থান তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না বলে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। নেতাকর্মীরা মনে করেন দলের দু-চারজন নেতা মন্ত্রী হওয়ার জন্য ব্যক্তিস্বার্থে দলের বড় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়ার ষড়যন্ত্রে নেমেছেন।

এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, প্রকৃত অর্থে বিরোধী দল হতে না পারলে জাতীয় পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাদের প্রিয় দলের এ করুণ পরিণতি দেখতে চান না। বরং জনমুখী বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে দলকে শক্ত হাতে এগিয়ে নেয়ার দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও প্রত্যাশা সংসদে জাতীয় পার্টি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক। যেখানে তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবেন।

তাদের মতে, একই সঙ্গে বিরোধী দলে ও সরকারের অংশীদার হয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করা যায় না। বিরোধী দল সরকারের অংশ হতে পারে না। গত মেয়াদে সরকারের অংশ হয়েছিল বলেই এবার সংসদে দলটির আসন কমেছে ১২টি।

ফের যদি তারা সরকারের অংশ হয় তবে আগামীতে আরও আসন কমবে। এক পর্যায়ে জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে তারা মনে করেন।

বিশ্লেষকরা বলেন, দ্বৈত ভূমিকার কারণে অনেক সময় ইচ্ছা না থাকলেও সরকারের নেতিবাচক কাজের দায় নিতে হয়ে জাতীয় পার্টিকে। একই ভাবে বিরোধী দলের ভূমিকার কারণে সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। এসব কারণে দল যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি ক্ষুণ্ণ হয় সরকারের ভাবমূর্তিও।

তারা বলেন, কোনো দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংখ্যা কার্যকর বিরোধী দল হওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে না। অল্পসংখ্যক এমপি গঠনমূলক ভূমিকার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও এমন নজির আছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

দলের নেতাকর্মীদের মতে, দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হয়েও সরকারের অংশীদার হয়েছিল। একজন মন্ত্রী এবং দুই প্রতিমন্ত্রী হন দলের তিন নেতা। এরা মন্ত্রিসভায় থাকায় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি জাতীয় পার্টি।

এতে ৫ বছর ধরে তীব্র সমালোচনার মুখে ছিলেন দলের নেতাকর্মীরা। দলের ক্ষতি করে লাভবান হয়েছেন মাত্র গুটিকয়েক নেতা। তারা সরকারের নেতিবাচক কোনো কাজের সমালোচনা না করে দলকে চাপের মধ্যে ফেলেছেন।

নেতাকর্মীদের দাবি থাকলেও সংসদে সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তারা তেমন কিছুই বলেননি। গত মেয়াদে অনেকবার বলা হয়েছে, জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা পদত্যাগ করে সরকার পক্ষ ছাড়ছেন। সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়গুলো আলোচনাও হয়েছে।

দলের চেয়ারম্যানও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেননি। এতে দল দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা মনে করেন মন্ত্রীরা পদত্যাগ করে সরকার থেকে বেরিয়ে এলে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো।

কিন্তু এসব না করায় দলের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের আসন কমেছে। দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পেয়েছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে পায় ২২টি। গতবারের চেয়ে এবার ১২টি আসন কমেছে।

অবশ্য এবারের নির্বাচনকে গতবারের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, ধানের শীষ যেখানে মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে, সেখানে ২২ আসন পেয়েছে লাঙ্গল। ২২ আসন পেয়েই জাতীয় সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে।

দশম সংসদের চেয়ে এবারের ফল খারাপ হলেও এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, দেশব্যাপী জাতীয় পার্টির গণভিত্তি আছে, মানুষ দলটিকে যে ভালোবাসে, এটা ফের প্রমাণিত হয়েছে।

এখন দলকে যদি আরও সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তবে আগামী নির্বাচনে খুবই ভালো ফল করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। এ অবস্থায় নেতারা যদি এবারও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদ নিয়ে সরকারের অংশদার হয় তবে আগামী দিনে দলের সব সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে।

মানুষ বারবার লাঙ্গল প্রতীকের দিকে ফিরে তাকাবে না। তারা মুখ ফিরিয়ে নেবে। কাজেই দলের কেউ যাতে আগের পথ অনুসরণ না করেন, এ দাবিতে সোচ্চার সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

তারা বলেন, আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে জাতীয় পার্টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষতি তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারে না গিয়ে বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারলে জাতীয় পার্টির জন্যই মঙ্গল হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বুধবার বলেন, ‘আমরা মাত্র নির্বাচিত হলাম। আমাদের দলের ২২ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগে আমরা শপথ নিই, পরে নিজেরা বসে সিদ্ধান্ত নেব কী করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘দশম জাতীয় সংসদে আমরা প্রধান বিরোধী দল ছিলাম, একই সঙ্গে সরকারেও ছিলাম। এবারের নির্বাচনেও আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে নির্বাচন করেছি। এখন আমরা সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এ অবস্থায় আমরা কি কেবলই প্রধান বিরোধী দলে থাকব নাকি সরকারের সঙ্গেও থাকব, তা আলোচনা করে ঠিক করব।’

বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারের থাকা না থাকা নিয়ে জাতীয় পার্টির যৌথ সভায়ও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বুধবার পার্টি চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে দলটির প্রেসিডিয়াম এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে এই যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে সরকারে থাকা না থাকা নিয়েও আলোচনা হয়।

অনেকেই এ সময় বিরোধী দলে থাকার পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরে বলেন, জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারলে দল লাভবান হবে। সরকারে থাকলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাভবান হবেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন।

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করে জাতীয় পার্টি পায় ২২ আসন। এর মধ্যে দুটি আসন ছিল উন্মুক্ত।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করে ৩৪টি আসন পায়। ওই নির্বাচনের পর তারা একাধারে প্রধান বিরোধী দলে থাকার পাশাপাশি সরকারেরও শরিক হয়। এবারের নির্বাচনে ১২টি আসন কম পেলেও জাতীয় পার্টিই দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

দশম সংসদের শুরুতে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী। এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে বিরোধী দলের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল সরকারি দল।

ডা. রুস্তম আলী ফরাজী এবার লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন। এবার তারা কী করবেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জাতীয় পার্টির বেশির ভাগ নেতাকর্মীর পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করেন দলটি সরকারে না থেকে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা পালন করুক।

তাদের মতে, সংখ্যার বিচারে জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা কত- এ বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে সব পক্ষের জন্যই শুভ হবে। কম আসন পেয়েও কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা যে পালন করা যায়, তার উদাহরণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আছে। বাংলাদেশেও আছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় পার্টিও চাইলে সরকারে না গিয়ে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে পারে।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বুধবার বলেন, ‘দশম জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয় এতে করে জাতীয় পার্টিই দল হিসেবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা সরকারের শরিক না হয়ে কেবলমাত্র বিরোধী দলে থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে দল হিসেবে লাভবান হতো, সংসদও অর্থবহ এবং কার্যকর হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার জাতীয় পার্টি কী করবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে এবারও যদি তারা সরকারের সঙ্গে থাকে তাহলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।’

সংসদ বিষয়ক গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দশম জাতীয় সংসদে যে বিরোধী দল ছিল তাকে বাস্তবে বিরোধী দল বলা যায় না। কারণ তারা তো সরকারেই ছিল। এবারও একই অবস্থা হলে তা ভালো হবে না।’

দলের ভালো চাইলে সরকারের অংশীদার হওয়া যাবে না। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে থাকলে মহাজোটের শরিক হিসেবে সরকারেরও লাভ হবে দল হিসেবে জাতীয় পার্টিও উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দলের কেউ মন্ত্রী হলে সরকারের সব ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। তখন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হলেও নেতিবাচক কোনো কাজের সমালোচনা করা যায় না। সংসদেও কিছু বলা যায় না, বাইরেও নয়। নেতিবাচক কিছু বললেও মানুষ বিশ্বাস করে না।

ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সরকারের ভালোমন্দ সব কাজের দায় নিতে হয়। অন্য দিকে এ ধরনের শরিকরা সরকারের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে সরকারে থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে।

অন্যদিকে মাঠের বিরোধী দল যে কোনো ইস্যুতে আন্দোলনে নামলে একই সঙ্গে সরকার এবং সংসদে বিরোধী দলে থাকা সংগঠনের নেতারা ক্ষমতাসীনদের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় সরকারকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।

তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রে দু’পক্ষের জন্যই একটা পিছুটান কাজ করে, যা এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। এ অবস্থা থেকে দুপক্ষেরই বেরিয়ে আসা উচিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা কত- এ বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে সব পক্ষের জন্যই তা ভালো হবে। কম আসন বিরোধী দল হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হতে পারে না। অল্প আসন পেয়েও কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা যে পালন করা যায় তার উদাহরণ আছে অনেক।’

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জাপার প্রায় সব সাংসদই সরকারে থাকার পক্ষে অভিমত দেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।

বৈঠকে উপস্থিত জাপা সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা জানান, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ আমরা সবাই এখন মহাজোটের এমপি। জনগণও আমাদের মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সবাইকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তাই সবাই মহাজোটে থাকবো, সবাই মিলে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করবো।

তিনি জানান, বিরোধী দলে নয়, মহাজোটে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। তবে সবকিছুই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার।

জানা গেছে, একাদশ সংসদে জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী হবে- তা নির্ধারণে জাপার নব নির্বাচিত সাংসদগণ দলের জ্যেষ্ঠনেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে সংসদে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ্ এরশাদ ছাড়া বাকী সব সাংসদ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে দলের কো চেয়ারম্যান জিএম কাদের এমপি, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, মুজিবুল হক চুন্নু এমপিসহ প্রায় ১৬জন সাংসদ বক্তব্য রাখেন। তাদের সবাই মহাজোটে থাকার বিষয়ে অভিন্ন সুরে কথা বলেন। মহাজোটের অংশ হিসেবে জাতীয় পার্টি মহাজোটেই থাকবে এমন অভিমত দেন। নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কথা মনযোগ দিয়ে শুনেন রওশন এরশাদ। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণও করেন তিনি। সবার সম্মতিতে শেষ পর্যন্ত মহাজোটে থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। সিদ্ধান্তের বিষয়টি মহাজোটের শীর্ষনেতাদেরও জানিয়ে দেওয়া হবে। সরকারে নাকি বিরোধী দলে এ নিয়ে মহাজোটের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে জাপার শীর্ষনেতাদের বৈঠকের কথা রয়েছে।সেখানে আলোচনার পর চূড়ান্ত হবে আসলে জাতীয় পার্টি একাদশ সংসদে সরকারে থাকছে নাকি বিরোধী দলে।

বৈঠক শেষে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করেছি। তাই সব এমপিই সরকারের সাথে থাকতে চান।

তাহলে কি সংসদে বিরোধী দল থাকবে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণই তো বিরোধী দল চায়নি। উন্নয়নের স্বার্থে জনগণই মহাজোটকে ২৯২ আসনে ভোট দিয়ে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছে। তবে আমরা মহাজোটে থাকবো নাকি বিরোধী দল হবো-এ ব্যাপারে মহাজোটের মহানেত্রী শেখ হাসিনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

বৈঠকে বরিশাল-২ আসনের এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু (জাপার উম্মুক্ত প্রার্থী), ফেনী-৩ আসনের এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, বরিশাল-৬ আসনের এমপি রত্না আমিন হাওলাদার, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান, বগুড়া-২ আসনের এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, নীলফামারী-৩ আসনের এমপি রানা মোহাম্মদ সোহেল, নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আহসান আদেলুর রহমান, কুড়িগ্রাম-২ আসনের এমপি পনিরউদ্দিন আহমেদ, গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, পিরোজপুর-৩ আসনের এমপি রুস্তম আলী ফরাজী, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি পীর ফজলুর রহমান, বগুড়া-৩ আসনের এমপি নুরুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।