যেভাবে ফোনে আড়িপাতে পেগাসাস

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২১ | আপডেট: ৮:৩৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২১

ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে আড়ি পাতার ঘটনা ফাঁস হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছেন সাংবাদিকেরাও। রোববার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আড়ি পাতা হয়েছে বিশ্বের ১৮০ সাংবাদিকের স্মার্টফোনে। গার্ডিয়ানসহ ১৭টি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক সংবাদ সংস্থা ফরবিডেন স্টোরিজ এবং লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রথম এ তথ্য পায়। পরে তারা বিষয়টি ১৭টি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে শেয়ার করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ভিত্তিক এনএসও গ্রুপের তৈরি করা স্পাইওয়্যার পেগাসাস সফটওয়ার ব্যবহার করে এই আড়িপাতার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিক্ত্ব যেমন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, এমনকি কোনো কোনো দেশে ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্যদের স্মার্টফোনেও আড়িপাতা হয়েছে। মূলত কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর সরকার আড়িপাতার কাজে এই স্পাইওয়্যারটি ব্যবহার করেছে।

এনএসও গ্রুপ নামে একটি ইসরায়েলি কোম্পানি তাদের পেগাসাস স্পাইওয়্যার বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে বিক্রি করছে। যা দিয়ে মূলত মানুষের ফোনে আড়িপেতে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

২০১৬ সাল থেকে ৫০ হাজার ফোন নম্বরকে এই স্পাইওয়্যার টার্গেট করেছে। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট, ফ্রান্সের লা মোঁদসহ বিশ্বের বড় বড় পত্রিকা রোববার (১৮ জুলাই) এমন খবর প্রকাশ করেছে।

তবে কোথা থেকে এই ফোন নম্বরগুলো পাওয়া গেছে, সত্যিকার অর্থে কতগুলো ফোন হ্যাকড হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তবে তারা কোনো ভুল করেনি বলে জানিয়েছে এনএসও গ্রুপ।

তাদের দাবি, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারে এই ম্যালওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এটি কেবল সামরিক বাহিনী, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সরবরাহ করা হচ্ছে, যাদের মানবাধিকার রেকর্ড ভালো।

এনএসও গ্রুপের সফটওয্যার যে কোনো ফোন কল রেকর্ড, বার্তা কপি ও গোপনে ভিডিও ধারণ করতে পারে। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কোম্পানির উদ্ভাবিত সবচেয়ে শক্তিশালী স্পাইওয়্যার পেগাসাস।

অজ্ঞাতসারেই এটি মানুষের ফোনে ঢুকে যায়। এরপর ২৪ ঘণ্টা ডিভাইসটিতে নজরদারি করে। ফোনে আসা কিংবা পাঠানো যে কোনো বার্তা কপি করতে পারে এবং কল রেকর্ড করে এটি।

ফোনের ব্যবহারকারীকে না জানিয়েই তার সব কর্মকাণ্ড রেকর্ড করতে পারে এই স্পাইওয়্যার। কথোপকথন রেকর্ড করতে মাইক্রোফোনও সক্রিয় করে দিতে পারে। আপনি কোথায় আছেন, কোথায় ছিলেন এবং কার সঙ্গে দেখা করেছেন, সবকিছুই ফোনের মাধ্যমে জানা সম্ভব হবে।

পেগাসাস একটি হ্যাকিং সফটওয়্যার বা স্পাইওয়্যার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে যা বিক্রি করে যাচ্ছে ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও। আইওএস কিংবা অ্যাড্রয়েড পরিচালন ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি ফোনে ছড়িয়ে পড়তে পারে আড়িপাতার এই ম্যালওয়্যার।

প্যাগাসাসের আগের সংস্করণটি স্পিয়ার-ফিশিং-টেক্সট ম্যাসেজ কিংবা ইমেলের মাধ্যমে মানুষের ফোনে ঢুকে পড়েছিল। ফিশিং বলতে ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের লিংকে কাউকে ক্লিক করতে প্রলুব্ধ করাকে বোঝায়। পরে ওই লিংকের মাধ্যমে ফোন কিংবা কম্পিউটারের সব তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতারণার মাধ্যমে কারো কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারী নাম ও পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করাই ইন্টারনেটে ফিশিং। ধোঁকাবাজরা এই পদ্ধতিতে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইট সেজে মানুষের কাছ থেকে তথ্য চুরি করে। ইমেইল ও ইনস্ট্যান্ট মেসেজের মাধ্যমে সাধারণত ফিশিং করা হয়ে থাকে।

কিন্তু এ সময়ে এসে মোবাইল ফোনে এনএসও’র হানা দেওয়ার সক্ষমতা আরও উন্নত হয়েছে। কথিত ‘জিরো-ক্লিকের’ মাধ্যমেও এটা করা সম্ভব। ফিশিং পদ্ধতিতে ফোনে ঢুকতে ব্যবহারকারীর নিজের সংশ্লিষ্টতা থাকত। অর্থাৎ যিনি ফোন ব্যবহার করছেন, তাকে ফিশিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো ওয়েবসাইটে ক্লিক করতে হতো।

কিন্তু ‘জিরো-ক্লিক’ তার কোনো দরকার পড়ে না। ফোন ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতসারেই তা ডিভাইসে ঢুকে গিয়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করতে পারে। এতে ফোনের ‘জিরো-ডে’ ঝুঁকির অপব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন একটি ঝুঁকি, যেটা মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারীরা নিজেরাও জানেন না। যে কারণে বাজারে ছাড়ার পরেও ফোনের এই ঝুঁকি তারা দূর করতে পারেন না।

এছাড়া আইম্যাসেজ কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো যেসব সফটওয়্যার আগে থেকেই যেসব ফোনে ইনস্টল করা থাকে, এনএসও সেগুলোকে অপব্যবহার করে স্পাইওয়্যার অনুপ্রবেশ করাতে পারে। ফোনে হানা দেওয়ার জন্য পেগাসাস এই পদ্ধতি ব্যবহার করেও সফল হয়েছে।