যেভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মেয়ে ‘রিফিউজি’ হিসেবে অলিম্পিকে

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:৫৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২১ | আপডেট: ৪:৫৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২১
নিগারা শাহীন। ছবি: টুইটার

আফগানিস্তানের মেয়ে আফগান জাতীয় সংগীত গাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সুযোগ শৈশবে নিগারা পাননি কখনো। শরণার্থী শিবির ছিল যার ঠিকানা সেখানে দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা আছে সেটাই তো অনেক! তবে স্রষ্টা যার কপালে ভালো কিছু লিখে রেখেছেন তিনি একদিন বড় হবেন-ই। তাইতো শরণার্থী শিবিরের সেই নিগারা এখন টোকিও অলিম্পিকের মঞ্চে।

জন্ম থেকেই নিজের দেশে যুদ্ধ দেখে আসছেন। প্রতিদিন গুলি-বোমার শব্দে ঘুম ভাঙত। এখনও তাই। ১৯৯৩ সালে যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে ৬ মাসের নিগারা শাহীনকে নিয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে পাকিস্তানে এসেছিল তার পরিবার। এরপর তারা দীর্ঘদিন দেশে ফিরেননি। তাই পাকিস্তানেই বেড়ে উঠেছেন শাহীন। শিখেছেন জুডো-কারাতে।

টোকিও অলিম্পিকের অংশ নিচ্ছেন ১২ ইভেন্টের ২৯ জনের শরণার্থী অ্যাথলেট দল। সেই দলে রয়েছেন নিগারা শাহীনও।

স্বপ্নপূরণের আনন্দ টের পাওয়া গেল তার কন্ঠে, ‘আমি সব সময়ই অলিম্পিকে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখেছি। নিজের স্বপ্ন ছোঁয়ার জেদ সব সময়ই আমার ছিল। যেদিন অলিম্পিকের শরণার্থী দল ঘোষণা করা হয় সেই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের। কারণ আমি সেই দলের একজন।’

আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া নিগারা মাত্র ছয় মাস বয়সে পাকিস্তানে চলে আসেন। জালালাবাদে ছিল তার পরিবার। ১৯৯৩ সালে যুদ্ধ চলাকালীন দুই দিন দুই রাত পায়ে হেঁটে তার পরিবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৮ বছর সেখানেই কাটিয়ে দেন নিগারা।

মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সাথে পাকিস্তান চলে আসেন শাহীন। ছবি: আল-জাজিরা।

নিজের কষ্টের সফরের কথা জানাতে গিয়ে নিগারা বলেন,‘আমাকে অনেক হয়রানি এবং অনেক বকাবকি করা হয়েছে। আমরা প্রচণ্ড সামাজিক চাপে বড় হয়েছি। আমাদেরকে টার্গেট করা হয়েছিল। মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমার নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছিল। যেখানে আজে বাজে কথা ছড়াত। পড়াশোনার কাজে যখন রাশিয়াতে ছিলাম তখন আমাকে কেউ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি জুডোতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। কিন্তু যে প্রত্যাশা ছিল সেরকম সহযোগিতা পাইনি। তবে সেসব উপেক্ষা আমাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। আমি কষ্ট পেয়েছি কিন্তু হেরে যাইনি। এজন্যই আজ এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি।’

পরিবারের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ,‘আমি খুবই ভাগ্যবান যে আমি এরকম উদার একটি পরিবার পেয়েছি। আমি ট্রেনিংয়ে যাবার পথে অনেকবারই হামলার শিকার হয়েছি। কিন্তু আমার বাবা-মা জানত আমার লক্ষ্য কী। এজন্য কখনো আমাকে থেমে যেতে বলেনি। অনুপ্রেরণা দিয়ে সব সময় পাশে থেকেছে।’

পাকিস্তানে শরণার্থী শিবিরে থাকাকালিন সময়গুলোর কথা বলতে গিয়ে নিগারা বলেন, ‘আপনি যখন অন্য কোনো দেশে আশ্রয়ে থাকবেন তখন আপনাকে কেউই স্বাভাবিকভাবে নেবে না। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছি। আমি ছোট বেলায় পাকিস্তানে গিয়েছিলাম। আমার আশেপাশে অনেক বাচ্চাদের দেখেছি যারা কষ্টে দিন কাটাত। আমরাও ছিলাম তাদের সঙ্গে।’

‘পেশোয়ারে যখন পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতো সবাই তখন খুব কষ্ট পেতাম। মনে হতো এটা তো আমার জাতীয় সংগীত নয়। গুনগুন করতাম। পাকিস্তানের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা এবং গর্ব হয়। সেখানে আমি বড় হয়েছি। এজন্য সেই দেশের মানুষকে সব সময় ভালোবাসি।’

অলিম্পিক শরনার্থী দলছবি: রয়টার্স

২৮ জুলাই অলিম্পিকে নিগারার অভিষেক হবে। জুডো ইভেন্টে লড়বেন। জুডোর প্রতি ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে নিগারা বলেন,‘আমি মার্শাল আর্ট, রেসলিং পছন্দ করতাম। মার্শাল আর্ট ক্লাবে যোগ দিয়েছিলাম। কারাতে শিখেছিলামও। যেখানে থাকতাম সেখানে এই একটি ক্লাবই ছিল। এজন্য অন্য উপায় ছিল না। ইসলামাবাদে অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্ট আমার কোচ আমাকে জুডো খেলার পরামর্শ দেন। সেই সময়ে পাকিস্তানে নারী জুডো খেলোয়াড় ছিল না। এরপর থেকে কারাতের পোশাকে জুডো খেলা শুরু করি। সেখানে নামার পর আমি ভিন্ন অনুভূতি পেতে থাকি। মনে হতে থাকে এটাই আমার কাঙ্খিত জায়গা, আনন্দের খেলা।’

১৮ বছর পাকিস্তানে থাকার পর আফগানিস্তান ফেরেন নিগারা। এখন সেখানেই থাকছেন। আফগান কিশোরীদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা, ‘আমি যেসব বাঁধা পেরিয়ে এসেছি সেসব এখন তারাও দেখছে। আমি যেহেতু সব বাঁধা টপকে পেরিয়ে এসেছি আমার বিশ্বাস তারাও একদিন সব পেরিয়ে চলে আসবে। এটা কঠিন কিন্তু মানুষের পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। নিজের প্যাশন কোনটা, কোথায় নিজেকে দেখতে চাই এসব নিশ্চিত হয়ে পথ চলতে হবে।’

শাহিন আশা করেন ২০২০ সালের টোকিওতে তার উপস্থিতি অলিম্পিকের তরুণ আফগান মেয়েদের আশা জোগাবে। ছবি: আল-জাজিরা

অলিম্পিকে তার যাত্রাও আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নিগারা বলছিলেন,‘আমরা কাতারে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেখানে আমাদের একজন কোভিড পজিটিভ হয়। মনে হচ্ছিল অলিম্পিকের সুযোগ আমরা হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু কিছুদিন পর সব ধোঁয়াশা কেটে যায়।’

অলিম্পিকের পর জীবন কেমন হতে পারে সেই ধারণাও দিয়ে রাখলেন তিনি,‘আমি সব সময় স্পোর্টসের সঙ্গে যুক্ত থাকবো। এটা আমাকে জীবন দিয়েছে। আমি জুডো ভালোবাসি। জুডোর কারণেই লড়াইয়ে শক্তি পেয়েছি। এখানে প্রশান্তি পেয়েছি, মানসিক পরিবর্তনও হয়েছে। এজন্য স্পোর্টসকেও কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই নিজের মতো করে।’