সিরিয়ায় নিহত আইএসের সেই ‘বাঙালি জঙ্গি’র পরিচয় মিলেছে

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৪৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৮ | আপডেট: ৮:৪৩:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৮
ছবিঃ সংগৃহিত

টিবিটি আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার কয়েকদিন পরেই মিডিয়ায় আলোচনার প্রধান ব্যক্তি হয়ে দাঁড়ায় এক জঙ্গি। আইএসের প্রচার করা ভিডিওতে দেখা যেতো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পাশ্চাত্যের প্রতি বিশোদগার করছে সে। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসা কমলা রঙের কয়েদি পোশাক পরা কোনো বন্দি।

এরপর হাতে থাকা ছুরি দিয়ে বন্দির শিরোশ্ছেদ করছে সে। পরে জানা গেল, ওই জঙ্গি আসলে ব্রিটিশ নাগরিক এমওয়াজি। তবে দুনিয়ার কাছে সে পরিচিতি পেয়েছিল ‘জিহাদি জন বা সিদ্ধার্থ ধর নামে। নির্মমতায় তার ধারে-কাছে অন্য কেউ ছিল না।

সেই সিদ্ধার্থ ধর অর্থাৎ ‘জিহাদি সিড’ বা আবু রুমায়শা নামে আইএস’র পরিচিত মুখ সম্প্রতি সিরিয়ায় সন্ত্রাসদমন অভিযানে মারা গেছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম।

ব্রিটিশ সন্ত্রাসদমন বিশেষজ্ঞ চার্লস লিস্টার সবার আগে টুইটারে সিদ্ধার্থের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। তবে এক সময় সিদ্ধার্থের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও লন্ডনের কট্টরপন্থী শিক্ষক, আনজেম চৌধুরীও একই সঙ্গে সিদ্ধার্থের মৃত্যুর খবর স্বীকার করেছেন।

অমরনাথ অমরসিঙ্গম নামে আর এক সন্ত্রাসদমন বিশেষজ্ঞ টুইটারে জানিয়েছেন, আবু তুরাব নামে এক আইএস জঙ্গির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সিরিয়ার রাকায় জঙ্গি দমন অভিযানে মৃত্যু হয় সিদ্ধার্থের। অভিযানে সম্ভবত মারা গেছেন সিদ্ধার্থের স্ত্রী-সন্তানরাও।

জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও সিদ্ধার্থ ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। উত্তর লন্ডনের পামার্স গ্রিন এলাকায় নানা জনগোষ্ঠীর বাস। অভিবাসীরাই থাকেন মূলত। মোটের উপরে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত পাড়া। প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে ধর পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে।

স্বামী-স্ত্রী, দুই মেয়ে ললিতা ও কণিকা আর ছেলে সিদ্ধার্থ। ঝরঝরে বাংলাতেই কথা বলেন সিদ্ধার্থের মা-বোন। সিদ্ধার্থর ১৬ বছর বয়সে মারা যান তার বাবা। সিদ্ধার্থের বোন কণিকা জানিয়েছিলেন, শান্ত-চুপচাপ স্বভাবের সিদ্ধার্থর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বাবার মৃত্যু। তার পর থেকেই এক কট্টরবাদী বন্ধুর পাল্লায় পড়ে একটু একটু করে পাল্টে যাওয়া। প্রতিবেশীদের মতে, সিদ্ধার্থ ভারী মিষ্টি ছেলে ছিল।

ব্রিটিশ পুলিশ বলছে, ব্রিটেনের একটি হিন্দু পরিবারে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। পরে সে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আবু রুমায়শা। দিনে দিনে তিনি মুহাজিরিন চক্রের নেতৃস্থানীয় এবং মূল বক্তা হয়ে উঠেন। তবে এই চক্র ব্রিটেনে সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ সংগঠন।

পরে মৌলবাদী মুসলমান হিসেবে রুমায়শা পরিচিত হতে শুরু করেন। মার্কিন-আরব-ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন সমাবেশে তাকে দেখা যেতে থাকে। এমনকি, টেলিভিশনেও তাকে মাঝে মাঝেই দেখা যেত। লন্ডনে কট্টরপন্থী মুসলমানদের কাছে তিনি অতি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন।

আয়েশা তারিক নামে এক মুসলমান তরুণীর প্রেমে পড়েই সিদ্ধার্থ ধর্ম বদল করেছিলেন বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। সিদ্ধার্থের প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, তুরস্কের বেশ কিছু অভিবাসী পরিবারের সঙ্গে মিশে কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকেন তিনি। বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে তাকে একাধিকবার গ্রেফতারও করে লন্ডন পুলিশ।

২০১৪ সালে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে প্যারিস হয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে যান। সিরিয়ায় থাকাকালীন এক হাতে রাইফেল আর অন্য হাতে এক সদ্যোজাতের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন সিদ্ধার্থ। ছবিটি নিয়েও প্রবল বিতর্ক হয়। এসব কারণে তাকে নজরে রেখেছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দারা।

সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার আগে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু জামিনে শেষ পর্যন্ত ছাড়া পান তিনি। যদিও বিনা অনুমতিতে তার বিদেশ যাওয়া আটকাতে পাসপোর্ট জমা রাখা হয়। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং সন্তানকে নিয়ে সিরিয়া পালিয়ে যান সিদ্ধার্থ।

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে প্যারিসের ট্রেন ধরে। সেখান থেকে সোজা সিরিয়া। গোয়েন্দারা প্রথমে এ তথ্য জানতে পাননি।

সিরিয়ায় পৌঁছে সিদ্ধার্থ কয়েক সপ্তাহ পরে তার সিরিয়াবাসের কথা টুইটে জানান। সঙ্গে একটি ছবি জুড়ে দেন। সেই ছবিতে দেখা যায়, সিদ্ধার্থের কোলে তার নবজাতক সন্তান এবং অন্য হাতে রাইফেল।

ছবির ক্যাপশনে লেখা : ‘ব্রিটিশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই জঘন্য। আর সে কারণেই আমি ব্রিটেন এবং আইএসের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারলাম।’ এর পর বিভিন্ন সময়ে তার নানা মৌলবাদী বার্তা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। তবে সিদ্ধার্থের মৃত্যু নিয়ে তার পরিবারের প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। আনন্দবাজার।