‘হত্যা নয়, উদ্দেশ্য ছিল অপহরণের’

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮ | আপডেট: ৯:২৯:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮

জামাল খাশোগির হত্যকাণ্ড সম্পর্কে সৌদি আরবের নতুন ভাষ্য।

ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসের ভেতরেই যে জামাল খাশোগি নিহত হয়েছেন তা স্বীকার করে নিয়ে শুক্রবার একটি বিবৃতি দিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখন একজন উর্ধ্বতন সৌদি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ সম্পর্কে যে সর্বশেষ ভাষ্য দিয়েছেন, তা আগের বিবৃতির সঙ্গে মিলছে না।

সৌদি আরবের আগের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, জামাল খাশোগি সৌদি কনস্যুলেটে ঢোকার পরপরই সেখানে উপস্থিত সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘুষোঘুষি শুরু হয়। সেসময় পেছন থেকে গলার ওপর দিয়ে হাত দিয়ে জাপটে ধরে নিরস্ত করার সময় তিনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।

কিন্তু উর্ধ্বতন একজন সৌদি কর্মকর্তা রয়টার্সকে যে ভাষ্য এখন জানিয়েছেন তা একটু ভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, যে ১৫ সদস্যের দল সৌদি আরব থেকে গিয়েছিল, তারা জামাল খাশোগিকে ঔষধ দিয়ে অচেতন করে অপহরণের হুমকি দেয়। কিন্তু খাশোগি তাতে বাধা দিলে তখন তাকে জাপট ধরলে তিনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। এরপর এই সৌদি দলের একজন সদস্য তার কাপড় খুলে তা পরেন এবং কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভান করেন যেন মনে হয় খাশোগি আসলেই বেরিয়ে গেছেন।

উল্লেখ্য, এ নিয়ে জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সৌদি ভাষ্য বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হলো।

সৌদি আরব প্রথমে জোর গলায় এই খবর অস্বীকার করেছিল যে কনস্যুলেটের ভেতর থেকে খাশোগি নিখোঁজ হয়েছেন। তারা দাবি করেছিলেন, সাংবাদিক খাশোগি কনস্যুলেট ভবন থেকে বেরিয়ে যান। ঘটনার ১৮ দিন পর সৌদি আরব স্বীকার করে যে খাশোগি কনস্যুলেটের ভেতরেই মারা যান।

অপহরণের পরিকল্পনা

উর্ধ্বতন এক সৌদি কর্মকর্তা এখন এই ঘটনা সম্পর্কে এখন যে সর্বশেষ ভাষ্য দিচ্ছেন তা এরকম:

‘১৫ সদস্যের সৌদি দলটি ইস্তাম্বুলে এসেছিল জামাল খাসোগজিকে অপহরণের উদ্দেশ্যে। তারা তাকে কনস্যুলেট থেকে তুলে নিয়ে ইস্তাম্বুলের বাইরে একটি ‘সেফ হাউজে’ আটকে রাখবেন এমনই পরিকল্পনা ছিল। খাশোগি সৌদি আরবে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল।’

‘কিন্তু শুরু থেকে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে শুরু করে। কারণ তারা উপরের নির্দেশ অমান্য করে গায়ের জোর খাটাতে শুরু করে। কনস্যুলেটে ঢোকার পর খাশোগিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কনসাল জেনারেলের কক্ষে। সেখানে মাহের মুতরেব নামে একজন তার সঙ্গে কথা বলেন এবং তাকে সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি এতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মাহের মুতরেবকে বলেন, তার প্রেমিকা বাইরে অপেক্ষা করছেন এবং এক ঘন্টার মধ্যে যদি তিনি ফিরে না আসেন তাহলে তুর্কি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে এসেছেন তাকে।’

‘কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মাহের মুতরেব যখন অপহরণের হুমকি দেন, তখন খাশোগি তার গলা চড়াতে থাকেন। তখন সৌদি দলটি আতঙ্কিত হয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তাকে জাপটে ধরা হয়, তার মুখের ওপর হাত চেপে ধরে চিৎকার বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। তাকে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছে ছিল না।’

‘এরপর জামাল খাসোগজির কাপড়, সানগ্লাস, অ্যাপল ওয়াচ খুলে তা পরেন মুস্তাফা মাদানি। কনস্যুলেটের পেছনের দরোজা দিয়ে তিনি এমনভাবে বের হন, যেন মনে হয় যে জামাল খাসোগজিই কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গেছেন।’

মৃতদেহ কোথায়

ঘটনা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে জামাল খাশোগির মৃতদেহ কোথায়?

এই সৌদি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর খাশোগির মৃতদেহ একটি কম্বলে মুড়িয়ে কনস্যুলেটের একটি গাড়িতে তোলা হয়। এরপর একজন ‘স্থানীয় সহযোগী’কে দায়িত্ব দেয়া হয় এই মৃতদেহ গুম করার। আর সৌদি দলের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সালাহ তুবাইগি এই ঘটনার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার কাজ শুরু করেন।

তুরস্কের কর্মকর্তাদের সন্দেহ খাশোগির দেহাবশেষ হয়তো ইস্তাম্বুলের কাছের বেলগ্রাড জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়েছে। এটি খুঁজে পেলে অনেক রহস্যের জট খুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সৌদি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন

জামাল খাশোগিকে সৌদি আরবে ফিরে যেতে রাজি করানোই যদি এই পুরো মিশনটির উদ্দেশ্য হয়ে থাকবে, তাহলে সেই দলে কেন এত এত সামরিক কর্মকর্তা আর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ঘটনার ব্যাপারে সৌদি ভাষ্য কেন বার বার বদলে যাচ্ছেও, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

এসব প্রশ্নের কোন বিশ্বাসযোগ্য উত্তর অবশ্য এই সৌদি কর্মকর্তার ভাষ্যে নেই। যেটি স্পষ্ট, তা হলো এই ঘটনা সৌদি আরবকে পুরো বিশ্বের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জামাল খাশোগির ঘটনা সৌদি রাজপরিবারের জন্য এক বিরাট সংকটে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা